আদব-কায়দা: গুরুত্ব ও তাৎপর্য

লুকমান হাকিম:

আদব শব্দটি বাংলা ভাষায় বহুল ব্যবহৃত ও প্রচলতি শব্দ। অর্থ: বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সভ্যতা, কৃষ্টি, সুিশক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা, নিয়মনীতি, পদ্ধতি ইত্যাদি। আদব-কায়দা মানে কাঙ্খিত শিক্ষা, সভ্যতা ও মার্জিত সংস্কৃিত দ্বারা আত্মগঠনের অনুশীলন করা।
ইবনু হাজার ‘আসকালানী রহ. বলেন: الأدب: استعمال ما يحمد قولاً وفعلاً কথায় ও কাজে প্রশংসনীয় ব্যবহারকে আদব বলে। কেহ বলেন:الأخذ بمكارم الأخلاق উত্তম চরত্রি লালন করাকে আদব বলে। কেহ বলেন: هو تعظيم من فوقك والرفق بمن دونك. আদব হলো ঊর্ধ্বতন ব্যক্তিকে সম্মান করা এবং অধস্তনকে স্নেহ করা। কেহ বলেন: الأدب هو حسن الأخلاق وفعل المكارم আদব মানে উত্তম চরিত্র এবং ভালো কাজ। আর ইবনুল কায়্যিম রহ. বলনে,الأدب اجتماع خصال الخير في العبد বান্দার মধ্যে উত্তম বৈশিষ্ট্যের সমাবেশ ঘটানোকে আদব বলে। কেহ বলেন: والأدب هو الخصال الحميدة. প্রশংসনীয় বৈশিষ্ট্যসমূহকেই আদব বলে। কাজেই বিনয়, নম্রতা, ভদ্রতা, সভ্যতা, কৃষ্টি, সুিশক্ষা, নৈতিকতা, মানবিকতা। নিয়মনীতি- ইত্যাদি গুণাবলী যে ব্যক্তির মধ্যে বিদ্যমান থাকে, তাকে ‘মুয়াদ্দাব’ (শালীন, ভদ্র ও সুশক্ষিতি) বলে। আর এসব গুণাবলী যার মধ্যে বিদ্যিমান নেই, তাকে ‘বেয়াদব’ (অশালীন, অভদ্র, অসভ্য) বলে।
মুসলিম জীবনে আদব-কায়দার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যবহুল। রাসুল সা. বলনে:
إِنَّ الْهَدْىَ الصَّالِحَ، وَالسَّمْتَ الصَّالِحَ، وَالاِقْتِصَادَ جُزْءٌ مِنْ خَمْسَةٍ وَعِشْرِينَ جُزْءًا مِنَ النُّبُوَّةِ (أبو داود).
“নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র, ভালো ব্যবহার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুয়্যাতের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ সমতুল্য। ইবনে আব্বাস রা. বলনে:
اُطْلُبْ الْأَدَبَ فَإِنَّهُ زِيَادَةٌ فِي الْعَقْلِ، وَدَلِيلٌ عَلَى الْمُرُوءَةِ، مُؤْنِسٌ فِي الْوَحْدَةِ، وَصَاحِبٌ فِي الْغُرْبَةِ، وَمَالٌ عِنْدَ الْقِلَّةِ. (ذَكَرَهُ الْحَاكِمُ فِي تَارِيخِهِ).
“তুমি আদব অন্বষেণ কর; কারণ, আদব হলো বুদ্ধির পরিপূরক, ব্যক্তিত্বের দলীল, নিঃসঙ্গতায় ঘনিষ্ঠ বন্ধু, প্রবাসজীবনের সাথী এবং অভাবের সময়ে সম্পদ।” আর আদব বা শিষ্টাচার এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যার দ্বারা ব্যক্তির জীবন পরিশুদ্ধ ও পরিপাটি হয়; আর এ আদব হলো দীন ইসলামরে সারবস্তু। সুতরাং মুসলিম ব্যক্তির জন্য জরুরি হলো আল্লাহ তাআলার সাথে, তাঁর রাসূল সা. এর সাথে এবং সাধরণ মানুষসহ সকল সৃষ্টির সাথে আদব রক্ষা করে চলা; আর এ আদবরে মাধ্যমইে একজন মুসলিম জানতে পারবে তার খাবার ও পানীয় গ্রহণের সময় তার অবস্থা কেমন হওয়া উচিৎ; কিভাবে তার সালাম প্রদান, অনুমতি গ্রহণ, বসা, কথা বলা, আনন্দ ও শোক প্রকাশ করা, হাঁচি দেওয়া ও হাই তোলার মত বিবধি কাজ সম্পন্ন হবে; আর কেমন ব্যবহার হবে তার পিতামাতা, ভাইবোন, আত্মীয়-স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও বন্ধু-বান্ধবদের সাথে। এক কথায় এ আদব-কায়দা রক্ষা করে চলার মাধ্যমেই একজন মুসলমি কাক্সিক্ষত মানের ভদ্র ও সভ্য মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে এবং নিজেকে অন্যান্য জাতির চেয়ে ভিন্ন বৈশিষ্ট যে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হবে; ফলে দীন ইসলামরে সৌন্দর্য ছড়িয়ে যাবে সমাজ, রাষ্ট্র ও দুনিয়ার দিক দিগন্তে। তাইতো কেউ কেউ শিক্ষার চেয়ে আদব বা শিষ্টাচারের বিষয়টিকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকেন; ওমর রাদয়িাল্লাহু ‘আনহু বলেন: تَأَدَّبُوا ثُمَّ تَعَلَّمُوا “তোমরা আগে সুসভ্য হও, তারপর জ্ঞান অর্জন কর।” আল-কারাফী তাঁর ‘আল-ফারুক’ গ্রন্থে বলেন: وَاعْلَمْ أَنَّ قَلِيلَ الْأَدَبِ خَيْرٌ مِنْ كَثِيرٍ مِنْ الْعَمَلِ “আর জেনে রাখবে, অনেক বেশি কাজের চেয়ে অল্প আদব অনেক বেশি উত্তম।” আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহ. বলনে:
لَا يَنْبُلُ الرَّجُلُ بِنَوْعٍ مِنْ الْعِلْمِ مَا لَمْ يُزَيِّنْ عِلْمَهُ بِالْأَدَبِ “ব্যক্তি কোনো প্রকার জ্ঞান দ্বারা মহৎ হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার জ্ঞানকে আদব দ্বারা সৌর্ন্দযম-িতি করবে।” তিনি আরও বলেন: نَحْنُ إلَى قَلِيلٍ مِنْ الْأَدَبِ أَحْوَجُ مِنَّا إلَى كَثِيرٍ مِنْ الْعِلْمِ “আমরা অনেক বেশি জ্ঞানের চেয়ে কম আদবকে অনেক বেশি জরুরি বা প্রয়োজন মনে করতাম।”
কোনো কোনো দার্শনিক বলেন: لَا أَدَبَ إلَّا بِعَقْلٍ، وَلَا عَقْلَ إلَّا بِأَدَبٍ “আকল (বুদ্ধি) ছাড়া আদব হয় না; আবার আদব ছাড়া আকলও হয় না।” অর্থাৎ একটি আরেকটির পূরিপূরক। আর জনৈক সৎব্যক্তি তার ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বললেন: اجْعَلْ عَمَلَك مِلْحًا وَأَدَبَك دَقِيقًا “তুমি তোমার আমলকে মনে করবে লবণ, আর তোমার আদবকে মনে করবে ময়দা।” অর্থাৎ তুমি আমলের চেয়ে আদবকে এত বেশি গুরুত্ব দিবে, লবণ ও ময়দার স্বাভাবিক মিশ্রণে উভয়ের অনুপাত যেভাবে কম বেশি হয়। মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমি (রহ.) তাঁর রচিত গ্রন্থ মসনবি শরীফে উল্লেখ করেন যে, ‘আয় খোদা জুইয়াম তাওফীকে আদব, বে আদব মাহরুম গাশত আয ফজলে রব। অর্থ: হে খোদা তুমি দয়া করে, আমাকে আদব ভিক্ষা দাও। কেননা বে-আদব আল্লাহর রহমত হইতে বঞ্চিত থাকে।
জালাল উদ্দিন রুমী আরো বলেন, বে-আদব বা তা খোদরা দাশতে বদ বালকে আতেশ দারহামা আফাক যাক।
অর্থ: বে-আদব শুধু নিজেকেই ক্ষতি করে না বরং সে পৃথিবীতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। বা আদব বা নসীব এবং বে আদব বে নসীব। ইমাম শাফেয়ী রাহ. ইমামে আযম আবু হানিফা রাহ. এর দরবারে গিয়ে উনার মাযহাবের প্রতি আদব দেখিয়ে নামাযে রাফেয়াদাইন করেননি। এটা আদব। ইমাম গাজ্জালি রাহ. বলেন: আমি আদব শিখেছি বেয়াদবের কাছে। আমার দোষ তুমি আমাকেই বল। আদব-কায়দা তথা ভদ্রতা কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নয়। ভদ্রতা পারিবারিক শিক্ষা।
ইমাম মালিক রাহ. বলেন”أمي تقول لي : اذهب إلى ربيعة فتعلم من أدبه قبل علمه”.
“আমার আম্মা আমাকে বললেন- (ইমাম) রবীআর নিকট যাও, এরপর তার থেকে তার ইলম শিক্ষার আগে তার আদব শিখে নাও।” (মাদারেক ১/১৩০)
আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারাক রাহ. বলেন: “طلبت الأدب ثلاثين سنة، وطلبت العلم عشرين سنة، وكانوا يطلبون الأدب قبل العلم”. ”আমি ৩০ বছর আদব শিখেছি আর ২০ বছর ইলম শিখেছি এবং সালাফে সালেহীনরা ইলম শেখার আগে আদব শিখতেন।” (গায়াতুন নিহায়া ১/১৯৮(
ইমাম ইবনুল জাওযি রাহ. বলেন- “كاد الأدب يكون ثلثي العلم”.: আদব হচ্ছে ইলমের এক তৃতীয়াংশ।” [সিফাতুস সফওয়াহ ১/৪৫]
ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনু ওয়াহহাব রাহ. বলেন- “ما تعلَّمنا من أدبِ مالكٍ أكثرُ مما تعلّمنا من علمه”.
“আমরা মালেকের ইলম অপেক্ষায় তার আদব সবচেয়ে বেশি শিখেছি।” (সিয়ারু আ’লা মিন নুবালা ৮/১১৩)
রাসূলুল্লাহ সা. বলেন, বাবা তার সন্তানের জন্য যেই শ্রেষ্ঠ সম্পদ রেখে যেতে পারে তা হচ্ছে- “সন্তানকে উত্তম আদব-নৈতিকতা তথা শিষ্ঠাচার শিক্ষা দেওয়া” [মুসলীম, বায়হাকী] আদব-কায়দা ও তরিয়ত-শরিয়তের ক্ষেত্রে পারিবারিক শিক্ষা অতীব গুরুত্ব বহন করে। শেখ সাদি রাহ. একজন সুফি সাধক হিসেবে পৃথিবীবিখ্যাত। সেই মহান ব্যক্তিকে একদিন একজন প্রশ্ন করলেন, জনাব আপনি এত আদব কীভাবে শিখলেন? তিনি জবাব দিলেন, দুনিয়ার সকল বেয়াদবদের দেখে-দেখে আমি আদব শিখেছি। আবার প্রশ্ন- কীভাবে? তিনি জবাব দিলেন, যখন বেয়াদবরা তাদের বেয়াদবি আচরণ করে আর দুনিয়ার মানুষ সেটাকে ঘৃণা করে তখন বুঝে নিই এই আচরণটা আমার করা উচিৎ নয়। এভাবেই আমি বেয়াদবদের কাছ থেকে আদব শিখি।

লুকমান হাকিম
জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট
lukmanbinashab@gmail.com

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *