আলোর ফোয়ারা

 

মাওলানা দিলাওয়ার হোসাইন
১৭৫৭ সালে পলাশীর আম্বরকাননে বাংলার স্বাধীনতার শেষ সূর্য অস্তমিত হলেও বৃটিশরা দীর্ঘ দিন এদেশের শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে হস্তক্ষেপ করার সাহস করেনি। কৌশলে ধীরে ধীরে এগুতে থাকে। ১৮৫৭ সালের আজাদী আন্দোলন দমন করার পর উপমহাদেশে হাজার বছরে গড়ে উঠা আরবী ও ফারসী-ভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দেয়। এক পর্যায়ে উস্তাযুল আসাতিযা ভারতের জ্ঞানসাগর মাওলানা মামলুক আলী নানুতভী রাহ. এর ছাত্র ইলমে নুবুওয়াতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্ক মাওলানা কাসিম নানুতভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা রশিদ আহমদ গাঙ্গুহী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা মোহাম্মদ মাযহার রাহমাতুল্লাহি আলাইহি, মাওলানা ইয়াকুব নানুতভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এগিয়ে আসেন। তাদের নেতৃত্বে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর রাহীমিয়া ও মোল্লা নিজাম উদ্দিন শাহলভীর দরসে নেযামী এ দুই ধারার সমন্বয় করে ১৮৬৬ সালে ঐতিহাসিক দেওবন্দ মাদরাাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। যা কাওমী মাদরাসা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। একদিকে বৃটিশ বিরোধী সংগ্রামকে জাগিয়ে রাখার শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে এই দেওবন্দ। অন্যদিকে নিবিড় জ্ঞানচর্চার সেরা একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা লাভ করে। তারই ধারাবাহিকতায় ও আদলে গোটা পাক ভারত উপমহাদেশে গড়ে উঠে এ জাতীয় আরো অনেক মাদরাসা। ‘জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট’ এগুলোর একটি ।
শাহজালালের স্মৃতিবিজড়িত পুণ্যভূমি সিলেট। এর গ্রামেগঞ্জে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য ইসলামী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। গতানুগতিক পদ্ধতিতে চলছে শিক্ষাদান। যুগ যখন এগিয়ে চলছে দ্রুত গতিতে, লেখাপড়ায়ও আসছে আন্তর্জাতিক মান, সবকিছুতে নতুনত্বের ছোঁয়া। পরিবর্তনের প্রয়োজন। চলছে প্রতিযোগিতা। গড়ে ওঠছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান। এরকমই এক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট।’
২০০৯ সালের ৭ই আগস্ট শুরু হয় এ প্রতিষ্ঠানের যাত্রা। অস্থায়ীভাবে কিছুদিন সাগরদিঘীর পাড় রোডস্থ মসজিদে এলাহির সন্নিকটে একাডেমিক কার্যক্রম শুরু হয়। তখন নাম ছিল “জামেয়া ইসলামিয়া সিলেট”। পরবর্তীতে ২০১০ সালে প্রাকৃতিক লীলাভূমি সিলেটের এয়ারপোর্ট এলাকায় পাড়ি জমায়। যেখানে চারিদিকে সবুজের সমারোহ। দৃষ্টিনন্দন চা-বাগান। ছোটবড় টিলা আর বৃক্ষঘেরা মনোরম পরিবেশ। এরই মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে জামেয়া ফরিদাবাদ।
শিক্ষাকার্যক্রম
পাঁচটি বিভাগে পরিচালিত হচ্ছে জামেয়ার শিক্ষাকার্যক্রমÑ
১. নাযারাহ বিভাগ।
২. হিফয সবক বিভাগ।
৩. হিফয তাকমীল বিভাগ।
৪. প্রতিযোগী গ্র“প।
৫. কিতাব বিভাগ।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই সুদূরপ্রসারি শিক্ষাকার্যক্রমের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে হিফয বিভাগ দিয়ে। ৫জন শিক্ষকের পাঠদান ও ৩৬জন ছাত্রের পড়াশোনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় অঙ্কুরিত জামেয়ার নতুন শিক্ষাবর্ষের প্রাথমিক যাত্রা। অতিবাহিত হয় প্রথম বৎসর। এভাবে হিফযের কার্যক্রম চলতে থাকে আরো তিন সাল। শুরু হয় নতুন চিন্তা। দেশের মাদারিসের সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে প্রথম ফারেগদের দিয়েই জামাতবিভাগ শুরু করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। জামাতবিভাগ চালু করতে গিয়ে নতুনকরে পরিদর্শন করা হয়, বাংলাদেশে বিদ্যমান কিতাবী শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন ধারা ও উপধারা। সামনে রাখা বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। শিক্ষাক্ষেত্রে দারসে নেযামী ও মাওলানা আবু তাহের মিসবাহ হাফিযাহুল্লাহ-কর্তৃক প্রণীত মাদানী নেসাবের সিলেবাস এবং তার পঠন-পাঠন পদ্ধতি। এদারা, বেফাক ও বিভিন্ন বোর্ডের উন্নতি-অবনতির নানান বিষয়। অবশেষে ২০১৩ সালের মাঝামাঝি ১৪৩৪ হিজরি সনের শাওয়াল মাস থেকে পরীক্ষামূলকভাবে ‘মাদানী নেসাব’ দিয়েই ১জন উস্তাদের পাঠদান ও ১০ জন ছাত্রের পাঠগ্রহণের মধ্যদিয়ে শুরু হয় জামাতবিভাগের যাত্রা। ।

এক. নাযারাহ বিভাগ
যারা ছোট এবং হিফযে পড়তে আগ্রহী, তাদেরকে এখানে ভর্তি করা হয়। সম্পূর্ণ পৃথক আবাসিক ব্যবস্থাপনায় শতাধিক শিক্ষার্থীকে নিয়ে পরিচালিত হয় এ বিভাগ। আন্তর্জাতিক হাফিয-কারীদের তিলাওয়াত ও লেখাপড়ার বিশ্বমান বজায় রাখার জন্য ব্যবহার করা হয় সাউন্ডসিস্টেমসহ মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টর। নিবিড়ভাবে মেহনত করা হয়, একবৎসর বা এর চেয়ে কমও। সাথে প্রয়োজনীয় ইংরেজি, বাংলা ও অংক পড়ানো হয়। রয়েছে প্রয়োজনমতো দুআ-দুরূদ, নামায-কালাম, মাসআলা-মাসাঈল ও তাজভীদ শিক্ষার ব্যবস্থা। বৎসর শেষে বাচ্চার সাহস, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতাকে সামনে রেখে নেওয়া হয় নতুন সিদ্ধান্ত। যারা হিফযের উপযুক্ত তাদেরকে দেওয়া হয় হিফয বিভাগে। আর যারা হিফযের উপযুক্ত নয় তাদের বিষয়ে কর্তৃপক্ষ, উস্তাদ, অভিভাবক ও ছাত্রের যৌথ পরামর্শে নেওয়া হয় অন্য সিদ্ধান্ত যা তাদের জন্য কল্যাণকর। ২৪ঘণ্টার রুটিন ও ৫জন প্রশিক্ষিত উস্তাদের তত্ত্বাবধান ও নিরলস প্রচেষ্টায় বর্তমানে নাযারাহ বিভাগ পরিচালিত হচ্ছে। নাযারাহ বিভাগে ভর্তির বয়সসীমা সর্বনিম্ন আট। ভর্তির সময় হচ্ছে আরবী শাওয়াল মাসের ১৫ তারিখ পর্যন্ত আর ইংরেজি পুরো জানুয়ারি মাস।
দুই. হিফয সবক বিভাগ
এ বিভাগে আবার তিনটি গ্র“প রয়েছে:
ক. হিফয প্রথম : ১ থেকে ১০ পারা পর্যন্ত সবকের ছাত্ররা।
খ. হিফয দ্বিতীয় : ১ থেকে ২০ পারা পর্যন্ত সবকের ছাত্ররা।
গ. হিফয তৃতীয় : ১ থেকে ২০ পারার উপরের সবকের ছাত্ররা।

তিন. হিফয তাকমীল
যারা বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ নেবে, তারা এ বিভাগের ছাত্র হিসেবে বিবেচিত।
চার. প্রতিযোগী গ্র“প
যারা বোর্ডের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশ গ্রহণ করে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের মধ্য থেকে যারা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশ গ্রহণে আগ্রহী তাদের জন্য বিশেষ এই বিভাগ।
উচ্চতর প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কয়েকজন উস্তাদের নিবিড় তত্ত্বাবধানে হিফয সবক, তাকমীল ও প্রতিযোগী বিভাগের কার্যক্রম চলছে ইনশাআল্লাহ।

পাঁচ. কিতাব বিভাগ
কিতাব বিভাগে রয়েছে চারটি জামাত।
১. এদাদিয়া।
২. মাদানী নেসাব প্রথম বর্ষ।
৩. মাদানী নেসাব দ্বিতীয় বর্ষ।
৪. সানাবয়্যিাহ আম্মাহ ২য় বর্ষ। (কাফিয়া)

এক. এদাদিয়া
দেশের হিফযশাখাগুলোতে আমাদের বাচ্চারা প্রায় ৮-৯ বৎসর বয়সে ভর্তি হয়ে যায়। ফলে প্রাথমিক বাংলা, গণিত, ইতিহাস, ভূগোল, সমাজ, ইংরেজির সাথে হিফযপড়–য়া বাচ্চাদের চলনসই পরিচয়-পরিচিতি হয় না। একান্ত হলেও কার্যকর থাকে না। আবার অনেক বাচ্চা, যারা প্রাথমিক পড়াশোনা শেষে হিফয শুরু করে থাকে। উভয় গ্রুপের ছাত্ররা হিফয শেষে কিতাব বিভাগে ভর্তি হতে হিমশিম খায়। তাদের বিষয় বিবেচনা করে বাংলা, ইংরেজি, ইত্যাদি মোটেও না জানা বাচ্চাদের পড়াশোনা আমরা এদাদিয়া জামাত থেকে শুরু করি। এদাদিয়া জামাতের বাচ্চাদের সাহস ও যোগ্যতা অনুসারে প্রত্যেক বিষয়ই আমরা সংশ্লিষ্ট প্রাথমিক কিতাব দিয়েই শুরু করি এবং শেষ করি সারফ জামাত বা মাদানী নেসাব ১ম বর্ষ পড়ার উপযুক্ত করতে প্রয়োজনীয় কিতাবাদির পাঠদানের মাধ্যমে।
এ জামাত পড়ার মাধ্যমে ছাত্ররা বাংলা, ইংরেজি, উর্দূ ও আরবী ভাষা পড়া-লেখা আয়ত্ব করে নিতে পারে। সাথে গণিতের সাথেও তার পরিচয় হয়ে যায়।

দুই. মাদানী নেসাব প্রথম বর্ষ
হিফযপড়–য়া বা যাদের আরবী, বাংলা, ইংরেজি, গণিত ইত্যাদি মাদানী নেসাব প্রথম বর্ষের জন্য চলনসই, তাদেরকে ভর্তি করা হয় মাদানী নেসাব প্রথম বর্ষে।

দু‘পর্বে পরিচালিত হয় এ জামাত। প্রত্যেক পর্বের সময় ছ‘মাস।
প্রথম ছ‘মাসের সিলেবাস: ১. আত তারীক ইলাল আরাবিয়্যাহ। ২. আত তামরীনুল কিতাবী। ৩. বাংলা। ৪. গণিত।

দ্বিতীয় ছ‘মাসের সিলেবাস: ১. আত তারীক ইলাল আরাবিয়্যাহ। ২. আত তামরীনুল কিতাবী। ৩. বাংলা (৫ম শ্রেণীর)। ৪. কাসাসুন নাবিয়্যিন ১ম খণ্ড। ৫. আত তারীক ইলাস সারফ। ৬. সহজ ইংরেজি। মাত্র একবছরের মেহনতে এ জামাতের ছাত্ররা আরবীতে কথা বলা ও লেখার যোগ্যতা অর্জন করে থাকে। এবং প্রাথমিক যেকোনো আরবী কিতাব নির্ভুলভাবে পড়ার কৌশল রপ্ত করতে সক্ষম হয়- আলহামদুলিল্লাহ।

তিন. মাদানী নেসাব দ্বিতীয় বর্ষ
এ জামাতও দু‘পর্বে পরিচালিত।
প্রথম ছ‘মাসের সিলেবাস: ১. আত তারীক ইলান নাহু। ২. আত তারীক ইলাল কুরআন ১ম খণ্ড। ৩. আত তারীক ইলাল উর্দু। ৪. আল কিরাআতুর রাশেদা। ৫. কাসাসুন নাবিয়্যিন ২য় খণ্ড। ৬. আত তারীক ইলাল ফিকহ। ৭. মানতিক। ৮. সহজ ইংরেজি।

দ্বিতীয় ছ‘মাসের সিলেবাস: ১. আত তারীক ইলাল কুরআন ২য় খণ্ড। ২. হেদায়াতুন নাহু। ৩. ইলমুস সীগাহ। ৪. আলফিকহুল মুয়াসসার। ৫. কাসুসন নাবিয়্যিন ৩য় খণ্ড। ৬. আল কিরাআতুর রাশেদা। ৭. মানতিক। ৮. ইমদাদুর উসুল। ৯. বাংলা।

চার. সানাবয়্যিাহ আম্মাহ ২য় বর্ষ (কাফিয়া)
এ জামাত এদারা বোর্ডের নির্ধারিত নিয়ম ও নেসাবের আওতাধীন। এ জামাতের ছাত্ররা বোর্ডের কেদ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়াও প্রথম তিন মাস ইংরেজি কথাবার্তা, প্রাথমিক লেখালেখি শেখানোর জন্য নির্ধারিত বইয়ের পাঠদান হয়।

এ জামাতের ছাত্ররা গত দুই বৎসর থেকে এদারা বোর্ডের কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে মুমতাযসহ আশাতীত ফলাফল করে বিজ্ঞ মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
ইনশাআল্লাহ আগামীতে মুখতাসার জামাত খোলার পরিকল্পনা রয়েছে।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *