উঠন্ত বেলায় অন্তিম বিদায়, লাখো মানুষের ঢল তার জানাযায়

 

আবদুল কাদির: ২৫ ফেব্রুয়ারি। শুক্রবার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও পূর্বাকাশে সূর্য ওঠেছে। নির্মল সোনালি আভা ছড়িয়ে দিয়েছে বসুন্ধরার বুকে। কিন্তু আজকের সূর্য প্রতিদিনের সেই সূর্য নয়। কিরণ তার সেই কিরণ নয়। এই কিরণের অন্তরালে আছে অব্যক্ত বেদনার অনুরণন। আছে অন্য এক শিহরণ। আছে কারো বিদায়ের বার্তা। ছেড়ে যেতে হবে এই পৃথিবী। আজ সেই বিদায়ী বার্তা নিয়েই তার আগমন। কিন্তু শুভবার্তা। এমন শুভ দিন শুক্রবারে আর ক’জনেরই বা শেষ বার্তা আসে। বিদায়ের ঘণ্টাধ্বনি বেঁজে ওঠে! বেঁজে ওঠে তাদের; যাদের তরে রয়েছে খুদায়ি রহমতের অজস্র ভাণ্ডার। প্রভুর অফুরন্ত করুণা। যারা জীবনের পরতে পরতে কামনা করেন তাঁর অনুগ্রহ। চান তার ভালবাসা। ব্যাকুল থাকেন তার রহমতের আশায়। তাদের জন্যেই এই দিন নির্ধারিত থাকে। তাদেরকেই আল্লাহপাক কাছে টেনে নেন। জড়িয়ে নেন আপন মায়াবি আঁচলে।

শায়খ আবদুল হাই রাহ. আল্লাহপাগল এক তুলনাহীন মানুষ। তিনি সেই দিনটির অপেক্ষায় থাকতেন অধীর। হাদীসে আছে, শুক্রবারে যে ইন্তেকাল করে, সে হয় জান্নাতি। তার মৃত্যু নেই। মরেও সে অমর। তার অপেক্ষা আর কামনা আজ বাস্তবে পরিণত হল। দীর্ঘ রোগভোগের সীমাহীন যাতনা। প্রতীক্ষার দীর্ঘ প্রহর গণনা। এর পর মহাপ্রভুর ডাক! তার জন্যে সে কী আনন্দের ব্যাপার! এক্ষুণি চলে যেতে হবে। চলেও গেলেন এভাবে।

বেলা তখন উঠন্ত। দ্বিপ্রহর প্রায়। জুমুআর দিন। মসজিদের মিনার থেকে মুয়াজ্জিনের সুললিত কণ্ঠে ভেসে এল আজানের সুমধুর ধ্বনি। শুরু হল নামাযের প্রস্তুতি। মাঠে মাঠে মুসল্লিদের ছুটাছুটি। পথে পথে মানুষের ঢল। শিশুদের কোলাহল। মাওলানা মাহমুদ। হযরতের সাহেবজাদা। তিনিও চলে যাচ্ছেন মসজিদে। হঠাৎ কী যেন তার মনে এল। ফিরে এলেন পিতার কাছে। দেখলেন পিতার অবস্থা বেশ ভালো নেই। প্রতিটি শ্বাস-নিঃশ্বাসে ধ্বনিত হচ্ছে আল্লাহু আল্লাহু। ইতঃমধ্যে শেষবারের মতো তার কণ্ঠে উচ্চারিত হল কালেমা শাহাদত। কারো আর বুঝতে বাকি রইল না। হযরত আর নেই। চলে গেছেন অন্য জগতে। আপন মাওলায়ে হকিকির সান্নিধ্যে।

আমি তখন জামেয়া ইসলামিয়া সিলেটে। ফোন পেলাম, মুহতামিম সাহেব আর নেই। কিছুক্ষণের জন্য জ্ঞান হারিয়ে ফেললাম। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেলাম। ক’দিন থেকে আমার প্রিয় উস্তাদ ফখরুযযামান সাহেব বলছিলেন, আবদুল কাদির! মুহতামিম সাহেবের কাছে একদিন যাও। সরাসরি হুজুরের মুখ থেকে তার জীবনী সম্পর্কে একটা জ্ঞান নিয়ে আসো। হঠাৎ কোন দিন চলে যাবেন, বলতেই পারবে না…। কিন্তু কাজের ঝামেলা। সুযোগ আর হল না। আজ-কাল করে করে দিনগুলো এমনিতেই চলে গেল। এভাবে তিনিও চলে গেলেন। আর ফিরে আসবেন না। গেলে হয়ত তার জীবনের অতল সমুদ্র থেকে নতুন কোনো মুক্তা আহরণ করে নিয়ে আসতে পারতাম। যেগুলো চলার পথে আমাদের পাথেয় হত। অন্ধকারচ্ছন্ন জীবনেরপথে আলোবর্তিকার কাজ দিত। কিন্তু আল্লাহর হুকুম; প্রাকৃতির নির্মম পরিহাস—তাকে যে এভাবেই চলে যেতে হবে।

তার মৃত্যুসংবাদ শুনে নিজেকে সামলে নিতে পারছিলাম না। দীর্ঘ পনর বছরের স্মৃতিগুলো। একে এক জড়ো হতে লাগল স্মৃতিপটে। আমি তখন নিজেকে হারিয়ে ফেলেছিলাম। এর পরও হুজুরের নির্দেশ। রেডিও অফিস যেতে হবে; পত্রিকায় নিউজ দিতে হবে; টিভি চ্যানেলে সংবাদ পাঠাতে হবে; ইমেইল করতে হবে। সবগুলো করলাম। কারণ? তার ভক্ত-অনুরক্তরা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বিশ্বের আনাচে-কানাচে। ওদের কাছে সংবাদ পৌঁছাতে হবে। যদিও তারা আসতে পারবে না; একবিন্দু অশ্রু তো গড়িয়ে পড়বে হুজুরের মহব্বতে। আর এ টুকুই তো যথেষ্ট। জীবনে মানুষের চাওয়া-পাওয়ার কতকিছু থাকে। কিন্তু শায়খ আবদুল হাই রাহ. কিছুই চাননি। চেয়েছেন একটু ভালবাসা। আবেগের উচ্ছ্বাসে টপকে পড়া একবিন্দু অশ্রু…।

শুক্রবার দুপুরে হযরতের ইন্তেকাল। ইন্তেকালের খবর মুহূর্তের মধ্যেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের আনাচে কানাচে। বিয়ানীবাজার পি.এইচ.জি স্কুল মাঠে জানাযা। সকাল ১১টায়। বিশাল মাঠ। ধারণক্ষমতা লাখের উপরে। সে এলাকায় এত বড় মাঠ আর নেই। আমরা ঘণ্টাখানিক আগে মাঠে পৌঁছে যাই। দেখি বাঁধভাঙ্গা লাখো মানুষের ঢল। হুজুরের লাশ রাখা হয়েছে মাঠের একেবারে সামনে। মাইকে চলছে গণ্যমান্যদের বক্তব্য। আবেগের উচ্ছ্বাসে কেউ কেউ নির্বাক হয়ে যাচ্ছেন। চোখের জলে নিজেকে সিক্ত করে ফেলছেন; জ্ঞান হারিয়ে ফেলছেন। এদিকে হুজুরকে দেখতে উৎসুক মানুষগুলোর ভিড়। ওদেরকে যেন থামানো যাচ্ছে না। বাঁশ দিয়ে বেড়া দেয়া হয়েছে মাঠের উত্তরদিকের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। কেউ তাকে দেখতে হলে বেড়ার ভিতর দিয়ে ঢুকতে হবে। সিরিয়েল ধরতে হবে। সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়াতে হবে। আমরাও সারিবদ্ধ হয়ে দাঁড়ালাম। দীর্ঘ সারি। পিপিলিকার সারির ন্যায়। মাঠের একেবারে পূর্ব প্রান্তের রাস্তা পর্যন্ত। দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। এর পরও শেষবারের মতো দেখা। একবার না দেখলেই নয়। এভাবেই দেখাদেখি চলছে।

ইতঃমধ্যে সময় ফুরিয়ে আসে। অনেকে দেখার সুযোগ পায়নি। জানাযার নির্ধারিত সময় এসে যায়। এত বিশাল মাঠ! কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে যায়। আমি দেখে হতবাক। নির্বাক। একজন অতি অপরিচিত ব্যক্তির জানাযা। কেউ তাকে চিনত না। বুযুর্গ বুযুর্গ বলে ধরনা দিত না। হাদিয়া তুহফা নিয়ে আসত না। বিশাল মাহফিলে কেউ তাকে আমন্ত্রণ জানাত না। মিছিল-মিটিংয়ে ডাকত না। যিনি তার সারাজীবন কাটিয়ে দিলেন নীরবে-নিভৃতে। অজপাড়া একটি গাঁয়ে। আজ তার জানাযা। এতগুলো মানুষের আগমন! বিদ্বান-গুণীজন, বিশিষ্ট আলেম-উলামা থেকে নিয়ে লেখক, সাংবাদিক, গবেষক, কলামিস্ট কেউ বাকি নেই। সবাই এসে উপস্থিত। এ-তো অকল্পনীয় এক ব্যাপার। আমার সন্দেহ জাগে—ওরা মানুষ? নাকি বদরপ্রান্তরের সেই মালাইকা…? নতুবা এতগুলো মানুষ জড়ো হয় কিভাবে? হ্যাঁ, হতেই পারে। আর কেনইবা হবে না? যার জীবনে একটি সন্নাতও মিস যায় নি। একটি তাহাজ্জুদ বাদ পড়েনি। একদিনও কুরআন পড়া বন্ধ হয়নি। এমকি ছোটবেলায়ও।

আমি তার ছোটবেলার স্মৃতিবিজড়িত গ্রামের অলিগলিতে হেটেছি। তার সমবয়সীদের সাথে দেখা হয়েছে। তাদের কাছে জানতে চেয়েছি—বাল্যজীবনে শায়খ আবদুল হাই রাহ. কেমন মানুষ ছিলেন? তারা সবাই তার ভূয়সী প্রশংসা করলেন।

একজন বাল্যসাথী আমাকে বললেন, আবদুল হাই লেখা-পড়ার প্রতি খুবই মনোযোগী ছিল। সুন্নতের খুবই পাবন্দ ছিল। আমরা তাকে মাঝেমধ্যে জোর করে খেলাধুলায় নিয়ে যেতাম। কোনোদিন তাকে নিয়ে মাছ শিকারেও বের হতাম। আমরা হাটুর উপরে লুঙ্গি বেঁধে মাছ ধরতাম। কোনোদিন উলঙ্গও হয়ে যেতাম। কিন্তু আবদুল হাই—কোনো দিনও হাটুর উপর লুঙ্গি উঠায়নি। আমাদের বয়স তখন ৮ কিংবা ৯ বছর। একদিন মাছ শিকারে গেলাম। বড়শি পানিতে ছাড়তে থাকলাম। একে একে ২০/২৫টি বড়শি পানিতে ছাড়লাম। হঠাৎ দেখি আবদুল হাই বড়শিগুলো তুলে ফেলছে! আমি হতবাক হলাম। এতগুলো বড়শি! ফেলতে অনেক সময় লেগেছে। কষ্ট হয়েছে। আবার তুলে ফেলছে। আমি বিস্মিত কণ্ঠে তাকে বললাম, কী হয়েছে? বড়শিগুলো তুলে ফেলছ কেন? কোনো দুর্ঘটনা ঘটেছে নাকি? সে উত্তরে বলল, হ্যাঁ; বিরাট দুর্ঘটনা! আমার আম্মাজান বলেছেন, যেকোনো কাজ শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে হয়! আমি আজ বড়শি ফেলতে বিসমিল্লাহ বলিনি…।

সেই মানুষ ছিলেন আবদুল হাই। তার জানাযায় এতগুলো মানুষতো হওয়ারই কথা। সাথে ‘মালাইকা’ থাকলে আশ্চর্য কিসে? ইতিহাস তো আমাদেরকে তা-ই বলে। যারা আত্মভোলা। আল্লাহ-প্রেমে পাগলপারা। তারা হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে লুকিয়ে রাখতে পারে না। একদিন না একদিন তা উন্মোচিত হয়ে যায়। মানুষ তাকে চিনে ফেলে। হয়ত একটু দেরি হয়। আবদুল হাই রাহ.কে মানুষ চিনেছে। তবে অবশেষে। যার বাস্তব প্রমাণ তার জানাযা; অবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সকলের স্বতঃস্ফূর্ত হাজিরা।

আজ তিনি আমাদের মাঝে নেই। তার পবিত্র কণ্ঠে আর কুরআনের তিলাওয়াত উচ্চারিত হয় না। ফজরের পর লাঠি হাতে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে তার পদচিহ্ন আর পড়ে না। টুপি-দাড়ি আর সাদা পঞ্জাবিওয়ালা সেই মানুষটির উজ্জ্বল চেহারা আর দেখা যায় না। তার পেছনে আর জুমুআর নামায আর পড়া হয় না। নসিহতপূর্ণ বাণী আর শোনা যায় না। আবেগজড়িত কণ্ঠে দুয়া আর হয় না। তাকে দেখা যায় না। ধরা যায় না। তিনি চলে গেছেন অনন্তের পথে। দূরে বহু দূরে। অজানার পথে। না-ফেরার দেশে। আমরা আজ মর্মে মর্মে উপলব্দি করছি তার শূন্যতা। প্রতিটি নিঃস্বাসে অনুভব করছি তার বিয়োগব্যথা। তিনি কিন্তু মরেও অমর। তিনি চিরঞ্জীব; চির ভাস্বর।

লেখক: শিক্ষক, জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট

Faridabad Jamia Sylhet

"সন্তান আপনার দায়িত্ব আমাদের" জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট الجامعة الإسلامية فريد آباد سلهت بنغلاديش

You may also like...