কাসিম নানুতবি রাহ. যেভাবে হুজ্জাতুল ইসলাম হলেন

আবদুশ শহীদ

হযরতের ইলমী উচ্চতার পাঁচ রহস্য
ইলম অর্জনের পথে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য হল আদব ও তাকওয়া। এক ব্যক্তি হযরত ইয়াকুব সাহেব নানুতুবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহিকে জিজ্ঞেস করল, সবাই যেসব কিতাব পড়ে কাসিম নানুতবিও তো একই কিতাব পড়ে। তবুও তাঁর মাঝে এত গভীর ইলম কোত্থেকে এলো? তখন ইয়াকুব নানুতবি বললেন, তার মাঝে অনেকগুলো অতুলনীয় গুণের সমাহার হয়েছে। এজন্য তাঁর ইলম এত বেশি। এক তো চিকিৎসা বিদ্যার কারণে মাওলানার মেযাজ অত্যন্ত স্থীর ও ভারসাম্যপূর্ণ। দ্বিতীয় এই যে, তাঁর উস্তাযও ছিলেন একজন বড় আলেম- হযরত মাওলানা মামলুক আলী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি । যার ইলমের গভীরতা ও ব্যাপকতা অনেক ব্যাপক। তৃতীয় হল হযরত কাসিম নানুতবি তাকওয়া-পরহেজগারিতে একজন অনন্য ব্যক্তি। তাঁর অবস্থান ছিল খোদাভীতির সর্বোচ্চ স্তরে। চতুর্থ গুণ, তাঁর মাঝে নেহায়েত আদব ও শিষ্টাচার ছিল। তিনি ছিলেন উস্তাযের প্রতি অত্যন্ত মুআদ্দাব। পঞ্চম ও সবচেয়ে বড় কারণ হল, তিনি হাজি ইমদাদুল্ল¬াহ মুহাজিরে মক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর মত বড় ওলীর সুহবত লাভ করেছিলেন।
উস্তাযের প্রতি কাসিম নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর আদব
হযরত কাসিম নানুতবির মাঝে উস্তাযের প্রতি শ্রদ্ধা ও ইহতিরাম অত্যাধিক পর্যায়ে ছিল। হযরতের অসুস্থতার সময়ে মাওলানা যুলফিকার আলী যখন তাঁর নিকট আসতেন তখন তিনি উঠে বসে পড়তেন। একবার মাওলানা যুলফিকার সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, হযরত! আপনি এমন করেন কেন? তিনি বললেন, হযরত আপনি আমার
উস্তায। মাওলানা যুলফিকার সাহেব বললেন, কীভাবে আমি আপনার উস্তায? কাসিম নানুতবি বললেন, একবার মাওলানা মামলুক আলী সাহেব কোনো এক কাজে ব্যস্ত ছিলেন। তখন আপনাকে বলেছিলেন,একে অর্থাৎ আমাকে কিছুটা কাফিয়ার সবক পড়িয়ে দিয়ো। তখন আমি আপনার নিকট সবক গ্রহণ করেছিলাম।
শায়খের এলাকার মানুষের প্রতি হযরতের শ্রদ্ধাবোধ
থানাভবনের জনৈক ব্যক্তির আহলে ইলমের সাথে গভীর মুহাব্বত ছিল। তিনি বলেন, একবার আমি দেওবন্দে হযরত কাসিম নানুতবির মজলিসে বসা ছিলাম। আলোচনা শেষে মাওলানা আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কোত্থেকে এসেছ? বললাম, থানাভবন থেকে। একথা শোনামাত্রই তিনি কেঁপে উঠলেন। আর আমাকে বললেন, হযরত! বেআদবি হয়ে গেছে। আপনি তো আমার পীর ও মুর্শিদের এলাকার মানুষ। আসুন আমার সাথে। দয়া করে বেআদবি মাফ করবে।
আদব ও শিষ্টাচার
হযরত হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি ও কাসিম নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর আদব ইহতিরামের বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, আমি আমার একটি কিতাব মাওলানা কাসিমকে অনুলিপি তৈরি করতে দিলাম। কিতাবের এক স্থানে হস্ত-লিখনে কিছু ভুল ছিল। মাওলানা পুরো কিতাবের অনুলিপি তৈরি করে নিয়ে আসলেন। তবে সেই স্থানটি খালি রেখে দিলেন। সহিহ করেও কিছু লেখেন নি সেখানে। কারণ তা হলে তা হবে শায়খের কথার সংশোধন। আবার কোনো ভুলও লেখেননি। কারণ এটা তো ইলমের ক্ষেত্রে বহুত বড় খেয়ানত। কিতাবটি দিতে এসে তিনি আমাকে বললেন, হযরত! এই স্থানটা পড়তে পারিনি। কিন্তু ভুল হয়েছে-একথা বললেন না। যাতে আমি সে জায়গা নিজে সংশোধন করে দিই। এভাবে আমি নিজে সেই জায়গা সহিহ করে লিখে দিলাম।

তাওয়াজ্জুহের আছর
হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কাসিম নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর গভীর ইলমের বিষয়ে একটি ঘটনা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, একবার ফজর নামাযে আমি সুরা মুয্যাম্মিল তেলাওয়াত করছিলাম। এমন সময় অকস্মাৎ আমার কলবের ভেতরে উলুমের এত ঢল নামল যে, আমি সহ্য করতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল এখুনি বুঝি রুহ বের হয়ে যাবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মাঝে সেই ঢল যেভাবে নেমেছিল সেভাবেই আবার উধাও হয়ে গেল। নামাযের পর অনেক চিন্তা ভাবনা করে বের করলাম, সে সময় হযরত কাসিম নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মিরাঠে বসে আমার প্রতি কলবি তাওয়াজ্জুহ প্রদান করছিলেন। সেই আছরে কলবে ইলমের জোয়ার উঠেছিল। এরপর হাকিমুল উম্মাত বললেন, আল্ল¬াহু আকবার যে মানুষটার তাওয়াজ্জুহের কারণে দীলের ইলম দরিয়ায় এমন মৌজ সৃষ্টি হয় যা তাহাম্মুল করা কষ্টকর হয়ে পড়ে না জানি সেই মহান ব্যক্তির দিলে ইলমের কত বড় সমুদ্র ও অসীম আকাশ লুকিয়ে আছে।
হযরত নানুতবির হাইবাত
একবার হযরত নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি মনে করলেন, হযরত থানবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি কোনো একটি কিতাবের নাম ভুলে গিয়েছেন। তখন অবিলম্বে তিনি আরেক প্রসঙ্গে আলোচনা শুরু করলেন। যাতে থানবির উপর হাইবাতের কোনো আছর না পড়ে এবং থানবির তবিয়ত স্বাভাবিক থাকে। হযরত নানুতবি বললেন, এক হল ইলম অর্জন করা। আরেকটি বিষয় হল রুসুখ ফিল ইলম। ইলমের ক্ষেত্রে গভীরতা অর্জন করা। শুধু পাঠ করাই যথেষ্ট নয়। বরং রুসুখ ফিল ইলম হাসিল করা জরুরি। এরপর তিনি একটি উদাহরণ দিলেন। এক ব্যক্তি ছিলেন হাফিযে হেদায়া। গোটা হেদায়া তার মুখস্থ ছিল। কিন্তু বুঝে পড়েননি। আরেকজন আলেম ছিলেন যিনি হেদায়ার হা. ছিলেন না, তবে পুরো কিতাব বুঝে বুঝে পড়েছিলেন। একবার হাফিযে হেদায়াকে দ্বিতীয়জন বললেন হেদায়াতে অমুক মাসআলাটি আছে। হাফিযে হেদায়া বললেন, না, হেদায়াতে এমন কোনো মাসআলা নেই। আমি হেদায়ার হা.। আমি জানি তো। এরপর দুজনে কিতাব খুললেন। তখন যিনি হা. ছিলেন না তিনি নির্দিষ্ট স্থান খুলে ইসতিমবাত করে মাসআলাটি বুঝিয়ে দিলেন। হেদায়ার হা. বিস্ময়াভূত হয়ে গেলেন। এই কিসসা শুনিয়ে নানুতবি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি থানবিকে বললেন, এই হল সাধারণ পাঠ ও গভীর অধ্যয়নের মাঝে পার্থক্য। কোনো একটি বিষয় বা কিতাবকে গভীর মনোযোগের সাথে পড়ে আত্মস্থ করার নামই হল রুসুখ ফিল ইলম।

 লেখকপরিচিতি
শিক্ষক, জামেয়া ইসলাময়া ফরিদাবাদ সিলেট

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *