শায়খ আবদুল হাই রহ., কিছু স্মৃতি কিছু কথা

ফখরুযযামান: ১৯৯৩ সালের শেষ সময়। আমি সবেমাত্র হিফয শেষ করে রামাযানের পর পরই ফযিলত ২য় বর্ষে ভর্তি হওয়ার জন্য জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরে হাজির। প্রথমে নাজিম সাহেব হুজুরের সাথে সাক্ষাৎ করে জামিয়ায় ভর্তি হই। আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের পার্শ্ববর্তী মাদরাসা মেওয়ায় দীর্ঘ প্রায় পাঁচ বৎসর লেখাপড়ার সুবাদে আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের সাথে ছিল পূর্বপরিচিতি। জামিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের মুহতামিম হিসাবে শায়খ আবদুল হাই সাহেবের নাম অবশ্য শুনেছি। তবে জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরে ভর্তি হওয়ার পূর্বে তাঁকে দেখেছি বলে মনে নেই। হয়ত দু’একদিন দেখেছি। ভর্তি হওয়ার পর ঠিক কোনদিন দেখেছি তা বলতে পারব না। কারণ মাদরাসার যাবতীয় কাজে দেখা যেত নাজিম সাহেব হুজুরকে। জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর বলতে বুঝা যেত নাজিম সাহেব হুজুরকেই। কারণ মুহতামিম সাহেব হুজুর রাহ. নিজেকে লুকিয়ে রাখতেন। যথা সম্ভব গুটিয়ে রাখতেন। সর্বক্ষেত্রে আগ বাড়িয়ে দিতেন নিজের আস্থাভাজন শাগরিদ নাজিম সাহেব হুজুরকে। নাজিম সাহেবও তাঁর সেই আস্থার প্রতিফল দিয়েছেন জামিয়াকে সঠিকভাবে পরিচালনা করে। নাজিম সাহেব হুজুরের কোনো সিদ্ধান্ত তাঁর মনঃপুত না হলেও এতে তিনি বাধা দিতেন না বা বাধ সাধতেন না। আমি অনেকবার এমন বলতে শুনেছি যে, বিষয়টি যদিও আমার বুঝে আসছে না কিন্তু বেটায় যেহেতু সিদ্ধান্ত দিয়েছেন তাহলে নিশ্চয় এতে কোনো হেকমত রয়েছে। এমন আস্থার পরাকাষ্ঠা কি কারো পক্ষে দেখানো সম্ভব? এমনও অনেক দিন হয়েছে যে, মাদরাসা বন্ধ হয়েছে কিন্তু মুহতামিম সাহেব হুজুর জানেন না। কিন্তু এতে কখনো তাঁর কোন প্রতিক্রিয়া বুঝা যায় নি। আসলে কোনো প্রতিক্রিয়া হয়নি। বলছিলাম আমি ফযিলত ২য় বর্ষে ভর্তি হওয়ার পর মাঝে মধ্যে মুহতামিম সাহেব হুজুরকে মাদরাসার অফিসে বসা দেখতাম। হুজুরের যেহেতু মেশকাত জামাতে কোনো ঘণ্টা নেই , অপরদিকে আমি হলাম জামেয়ায় নবাগত তাই তাঁর সাথে ছিল না আমার ব্যক্তিগত কোনো পরিচয়। ফলে তাঁর কাছে যাওয়ার তেমন সুযোগও হয়নি। আমার অনুমান ছিল হুজুর আমার নাম পরিচয়ও মনে হয় জানেন না। ফলে তাঁর কাছে যেতাম না। কিন্তু রাস্তায় সালামের জবাবের সাথে হালপুরসির ফাকে বুঝতে পারলাম হুজুর ব্যক্তিগতভাবে আমার নাম জানেন এবং মনে হয় আমাকে চিনেন। কারণ হুজুরের দ্বিতীয় জামাতা মাওলানা ইয়াকুব আলী (তাবলিগি হুজুর) হলেন আমার দ্বিতীয় ভাবির মামা। মনে হল এ আত্মীয়তা সম্পর্কেও হুজুর জ্ঞাত। যা ছিল আমার কল্পনারও বাহিরে। এত দূর সম্পর্কের আত্মীয়তার বিষয়েও হুজুরের খবর রয়েছে বুঝলাম।

হুজুর যে সর্ব বিষযে খুবই হুঁশিয়ার তা ছিল অনেকেরই অজানা। অনেকে মনে করতেন মুহতামিম সাহেব হুজুর সাদাসিধে। তা ঠিকই তিনি জীবন-যাপনে,চাল-চলনে ছিলেন সাদাসিধে। তবে খুবই দ্রুত ও সহজে জটিল থেকে জটিল বিষয় বুঝে নিতেন এবং সহজে সমাধনা ও দিতে পারতেন। আমার তো মনে হয় জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর-এর দ্রুত উন্নতি অগ্রগতির পেছনে যেমন রয়েছে তাঁর শেষ রাতের রোনাজারির ভূমিকা তেমনি তাঁর হুঁশিয়ারি ও সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ভূমিকাও ছিল অন্যতম।

আমাদের দাওরায়ে হাদিসের বৎসর হুজুরের কাছে আমরা ‘শামাইলে তিরমিযি’ নামক কিতাব পড়ার সুযোগ হয়। ওই বৎসর হুজুর লন্ডন সফরে যান। তাই বেশিদিন পড়ানোর সুযোগ হয়নি। যে কয়দিন পড়িয়েছিলেন- এর দ্বারাই হুজুরের সুন্দর পাঠদান পদ্ধতি,সাবলীল উপস্থাপন, শব্দের তাহকিক ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ যেভাবে করতেন তা দ্বারাই তাঁর ইলমি মাকাম অনুমান করা ছিল স্বাভাবিক। এ পাঠদানের দ্বারাই বুঝা যায় যে, হুজুর খুবই ভালো একজন শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে ইহতেমামির কারণে আগের মতো পড়ানোর সুযোগ হয় না।

১৯৯৬ সালে লন্ডন সফর করে রামাযানের পূর্বেই হুজুর ফিরে আসেন। যে হালতে সফর করেছিলেন সেই অবস্থায়ই ফিরে আসেন। সাধারণত দেখা যায় বিদেশ সফরের পর যে কারো লেবাস-পোশাক, চেহারা-সুরতে পরিবর্তন হয়। সাথে নিয়ে আসেন অনেক হাদিয়া তোহফা। হুজুরের কিন্তু কোনো পরিবর্তন হয়নি। সাথে নিয়ে আসেন নি কোন হাদিয়া তোহফা। এর কারণ এই নয় যে, এগুলো পাওয়ার সুযোগ নেই। বরং অন্য যে কারো ভক্ত অনুরক্ত ও শিষ্য-শাগরিদের চেয়ে তাঁর মোটেই কম ছিল না; বরং তিনি মাদরাসার খরচে গিয়ে নিজে ব্যক্তিগতভাবে যে কোনো উপায়ে লাভবান হবেন তা মোটেই মেনে নিতে পারতেন না। অনেক হাদিয়া তোহফা পেয়েছেন সব গেছে মাদরাসার ফান্ডে। সম্ভবত তাঁর সামনে জনৈক সাহাবীর সেই ঘটনাটি ছিল—জনৈক সাহাবীকে রাসূল সা. এক এলাকার খাজানা উসুলের জন্য পাঠিয়েছিলেন। তিনি ফিরে এসে রাসূলের সামনে কিছু মাল রেখে বলেন, এগুলো হল বায়তুল মালের আর এগুলো হল আমার- যা লোকেরা আমাকে হাদিয়া হিসাবে দিয়েছে। তখন রাসূল সা. তাকে জবাব দিয়েছিলেন, তুমি তোমার মাতা-পিতার  ঘরে  বসে থাকলে কি লোকেরা তোমাকে এ হাদিয়া দিত?

ওই বৎসরই নতুন মাদরাসার ভিত্তি স্থাপিত হয়। যে মাদরাসার এত বড় বড় বিল্ডিং, এত লক্ষ লক্ষ টাকা আয়-ব্যয়। এর যিম্মাদার ঠিক বিপরীত। তিনি রিক্তহস্ত। কোনো রকমে পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন-যাপন করেন। এবং তা ইচ্ছা করেই। দাওরায়ে হাদীসের দু’বৎসর পর জামিয়া মাদানিয়ায় শিক্ষক হিসাবে যোগদান করি। তখন ১৯৯৮ সাল। এ বৎসর মাদরাসার খুবই আর্থিক অনটন চলছিল। অবস্থা এমন ছিল যে, হুজুর প্রতিদিন সকালে মাদরাসার জন্য বের হয়ে কিছু কালেকশন করতেন, বিকালে তা দিয়ে বোডিংয়ের খরচ হত। একদিন সকালে তো রান্না করার মতো কোনো চাল নেই। বাবুর্চি অনোন্যপায় হয়ে দীর্ঘদিনের জমানো ওই সব চাল যেগুলোর অর্ধেকই ধান ছিল তা রান্না করে দিয়ে দেয়। আমরা উস্তাদগণ খানা খেতে বসে হতভম্ব হয়ে যাই। আমরা বুঝে ওঠতে পারছিলাম না-তা রান্না করা চাল না ধান। আমাদের শিক্ষকতার প্রথম বৎসরেই একাধারে প্রায় পাঁচ ছয় মাস বেতন পাওয়া যায়নি। একবার তো মাদরাসা বন্ধের দিন বাড়িতে যাওয়ার প্রাক্কালে কোন টাকা পাইনি। তবে এর কারণে হুজুরের প্রতি কোনো রাগ হত না। কারণ সবার একথা বিশ্বাস ছিল যে, হুজুরের কাছে কোনো টাকা থাকলে অবশ্যই তা দিবেন। সাধারণত দেখা যায় সাধারণ শিক্ষকরা মূল যিম্মাদারের প্রতিই বিরক্ত থাকেন। নানা মন্তব্য করেন। তবে আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের কোনো শিক্ষককে আমি কখনো হুজুরের প্রতি বিরক্ত বা তাঁর সম্পর্কে কোনো অশোভন মন্তব্য করতে শুনিনি।

একদিন পুরাতন মাদরাসা থেকে হুজুর ও আমি এক সাথে বের হই। হুজুর তাঁর মসজিদের হুজরায় যাবেন। আমি যাব নতুন মাদরাসায়। তখনো নতুন মাদরাসার কাজ পূর্ণ হয়নি। তবে আমি এবং সহপাঠি ও দীর্ঘদিনের সহকর্মী মাওলানা বিলাল আহমদ ইমরান সহ কয়েকজন ছাত্র ওখানে থাকতাম। রাস্তায় হুজুরের সাথে হাটছি। বিভিন্ন প্রসঙ্গে আলোচনা হচ্ছে। সুযোগ বুঝে এক ফাকে আমি বললাম, হুজুর বর্তমান সময়ে কওমি মাদরাসার প্রতি মানুষের আগের মত আগ্রহ নেই। মানুষ পূর্বের ন্যায় মাদরাসায় চাঁদা দেয় না। ছাত্রদের লজিং দেয় না। তাই মাদরাসার জন্য স্থায়ী ইনকামের কোন ব্যবস্থার চিন্তা করা প্রয়োজন। তখন হেটে হেটে আমরা হুজুরের মসজিদের ঠিক উত্তর পার্শ্বে প্রস্রাব খানার কাছে এসে গেছি। হুজুর মসজিদে চলে যাবেন। দাঁড়িয়ে গেলেন। আমার মুখোমুখি হয়ে বললেন, মাওলানা, দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্থায়ী কোনো ইনকামের ব্যবস্থা না থাকাই উত্তম। বিশেষ করে কওমি মাদরাসার। কারণ স্থায়ী ইনকামের ব্যবস্থা হয়ে গেলে একদিকে তাওয়াক্কুল কমে যাবে। অভাব-অনটন থাকলে আল্লাহর দিকে মনোযোগী হওয়া যায়। অপরদিকে স্থায়ী ইনকাম অনেক ফেতনা-ফ্যাসাদের পথ খুলে দেয়। পরস্পরে মনোমালিণ্য সৃষ্টি করে। তাই আমি চাই না মাদরাসার কোনো স্থায়ী ইনকামের ব্যবস্থা হোক। তখন জনগণেরও আর মাদরাসার প্রতি মনোযোগ থাকবে না। আমি চাই আমিসহ আপনারা সবাই আল্লাহর কাছে দুয়া করবেন। আল্লাহর কাছ থেকে চেয়ে আনবেন। ওই বৎসরও হুজুর লন্ডন গিয়েছিলেন কিন্তু মাদরাসার কোনো স্থায়ী ইনকামের ব্যবস্থা করেন নি। দেখা যায় যে কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অনটনের সময় লেখাপড়া ভালো হয়। ব্যবস্থপনা সঠিক থাকে। পরস্পরে শ্রদ্ধাবোধ ও মিল মহব্বত থাকে। ওই সময়ই যোগ্য লোক তৈরি হয়। আর যত সুযোগ-সুবিধা বাড়ে ,আয়েশ- আরাম বৃদ্ধি পায়। ছাত্ররা লেখাপড়া থেকে দূরে সরে যায়। যোগ্য লোক সৃষ্টি কমে আসে।

আমি হুজুরেকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছিল শিক্ষক হওয়ার কয়েক বৎসর পর যখন হুজুর  থাকা নিয়ে নয়া মাদরাসায় যান। তখন হুজুরের ও আমার কামরার মধ্যখানে মাত্র একটি রুম ছিল। প্রায়ই হুজুরের কাছে যেতাম, বসতাম। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতাম। বিশেষ করে মাদরাসা সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়াদি আলোচনা করতেনুুু। যত হুজুরের কাছে এসেছি তত শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভয় বেড়েছে। আমার মনে হত আমাকে হুজুর ভালবাসতেন। আস্থা রাখতেন। বিশ্বাস করতেন। আমার মনে আছে, যে কোনো বন্ধের সময় হুজুরের কাছে দুয়া চেয়ে বিদায় নিতে গেলে মুচকি হেসে বিদায় দিয়ে বলতেন, আমার জন্য দুয়া করবেন। আর আপনার আম্মার কাছে আমার আসসালামু আলাইকুম বলবেন।

হুজুর একদিকে আমার সরাসরি উস্তাদ অপরদিকে আমার অনেক উস্তাদের উস্তাদ। সাথে মাদরাসার যিম্মাদার। কিন্তু খুবই কম হুজুর কোনো কাজের জন্য আমাকে তাঁর রুমে ঢেকে পাঠাতেন; বরং তিনি নিজে আমার রুমে এসে যেতেন। ফলে খুবই বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো। হুজুর কোনো দিন সরাসরি এসে রুমে প্রবেশ করেন নি। বরং জানালার কাছে এসে গলা কাঁশি দিয়ে দরজায় এসে দাঁড়িয়ে সালাম করে বলতেন, মাওলানা রুমে আছনি? দরজার পর্দাটি পর্যন্ত ওঠাতেন না। সালামের জবাব দিয়ে আমি যখন পর্দা সরিয়ে বলতাম , হুজুর তাশরিফ আনেন তখন রুমে ঢুকতেন। এরকম কোনে বড় প্রতিষ্ঠানের মূল যিম্মাদারের কোনো কাজে সাধারণ কোনো শিক্ষকের রুমে নিজে যাওয়া কি কল্পনা করা যায়?  এটা ছিল হুজুরের সাধারণ অভ্যাস। কোনো প্রয়োজন দেখা দিলে ওই হুজুরের রুমে নিজে চলে যেতেন। ‘হুজুর আপনি খবর দিলে তো আমিই চলে যেতাম’ বললে জবাব দিতেন আপনারা কাজের লোক। আপনারা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত। আমি তো অবসর। কোনো কাজ নেই। খবর দিলে তো আপনার সময় নষ্ট হবে। তাই আমিই চলে আসলাম। এ ছিল তাঁর বিনয়ের অবস্থা। নিজেকে ছোট মনে করতেন। আর অন্যকে সব সময় নিজে থেকে বড় মনে করতেন। এটা তো বুযুর্গদের অভ্যাস। তাঁরা সব সময় নিজেকে ছোট মনে করেন।

হুজুর শুধু উস্তাদদের সম্মান করতেন। তাদের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখতেন তা নয়। বরং হুজুরের কারণে কোন ছাত্রের লেখাপড়ার সামান্যতম ব্যাঘাত ঘটুক তা মোটেই মেনে নিতে পারতেন না। একটি ঘটনা মনে পড়ে গেল। একদিন হুজুর দক্ষিণ দিক থেকে নতুন মাদরাসার দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ বৃষ্টি এসে গেলে রাস্তার পার্শ্বের জনাব হাজি আবদুল কুদ্দুস সাহেবের বাড়িতে ওঠেন। তখন ওই বাড়িতে আবদুুল্লাহ নামীয় সানবি ২য় বর্ষের একজন ছাত্র লজিং ছিল। সে নিজে আমাকে বর্নণা করে। হুজুর গিয়ে বৃষ্টির মধ্যে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তখন ছিল পরীক্ষার বন্ধ। তাই আমি দরজা বন্ধ করে জানালা খোলা রেখে পড়ছিলাম। হঠাৎ হুজুরের গলার কাঁশির শব্দ শুনে দরজা খোলে দেখি হুজুর বারান্দায় বৃষ্টির মধ্যে লাঠি ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। আমি দরজা খুলে হুজুরকে ভিতরে আসার কথা বললে, হুজুর জবাব দেন-তোমার পরীক্ষার সময় তুমি গিয়ে পড়। আমি বৃষ্টি থামলে চলে যাব। পরে আমার অনেক চাপাচাপিতে হুজুর ঘরে প্রবেশ করলেও বসে বলেন, তুমি পড়তে থাক। সামান্য পরে বৃষ্টি একটু থামলে হুজুর চলে যেতে উদ্যত হন। তখন আমি ছাতা নিয়ে তাঁর সাথে যেতে চাইলে ধমক দিয়ে বলেন, তুমি পড়বে আমার সাথে যাওয়ার কী প্রয়োজন? আমি একা যেতে পারব। আমি নাচোড়বান্দার মতো তাঁর সাথে গিয়ে তাঁকে মাদরাসায় পৌঁছে দিয়ে আসি। এ ছিল তাঁর অবস্থা। আমরা হলে কী করতাম?

আমি প্রথম যে বৎসর জামিয়া থেকে চলে আসার জন্য মনস্থির করি, তখন ২০০৫ সাল। একদিন আনুমানিক সকাল ১১টার দিকে দুরূদুরূ বুকে হুজুরের রুমে প্রবেশ করি। এদিন ছিল রামাযানের পূর্বে মাদরাসা বন্ধের তারিখ। হুজুর মনে করছেন আমি বাড়ি যাওয়ার জন্যে বিদায় নিতে গেছি। আমি নীরব ঠায় দাঁড়িয়ে আছি, কোনো কথা বলতে পারছি না। সাহস করে চাপাস্বরে প্রথমে বাড়ি যাওয়ার বিদায় নিয়ে রামাযানের পরে আমি আর জামিয়ায় আসব না একথাটিও ক্ষীণ কণ্ঠে বললাম। হুজুর কিছু সময় কোনো কথা বললেন না। একটু থেমে বললেন, মাওলানা, আমি মরে গেলে যার যেখানে ইচ্ছা চলে যেয়ো, আমি যতদিন জীবিত আছি এমন কথা আর কখনো বলবেন না। এ বৎসর আর জামিয়া থেকে আসা হয়নি। পরের বৎসর রামাযানে আবারো বিদায়ের জন্য হুজুরের বাড়ি সুপাতলায় তিন দিন যাই। একদিন সাথে ছিলেন বন্ধুবর মাওলানা খয়রুল ইসলাম বড়লেখি ও মাওলানা রুহুল আমীন তালিমপুরি । আরেকদিন মাওলানা আবু ইউসূফ নয়াগ্রামি।  কিন্তু হুজুর কোনো সময়ই বিদায় দেননি। অবশেষে যে বৎসর  জামিয়া থেকে চলে আসি তখন হুজুর অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী। সে বৎসর রামাযানে মাওলানা খয়রুল ইসলাম সাহেবসহ গিয়ে জামিয়ায় অবস্থানের ক্ষেত্রে আমার অপারগতার কথা বললে, আবারো প্রত্যাখ্যাত হয়ে আমি বললাম, হুজুর আমি যদি নাজিম সাহেব হুজুরের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে নিতে পারি তাহলে আপনি নারাজ হবেন না। হুজুর অবশেষে এতে সায় দিলে আমি নাজিম সাহেব হুজুরের সাথে দেখা করে বিদায় নেই। কারণ আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল হুজুরের নারাজি অবস্থায় জামিয়া থেকে আসলে আমাকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতে হবে। নানা ধরনের প্রতিকুল অবস্থার মুখোমুখি হতে হবে।  ইতোপূর্বে কয়েকজন শিক্ষকের বেলায় তা ঘটেছে। যেগুলো আমার জানা।

জামিয়া থেকে চলে আসার পরে আমি কিছুদিন পরপর হুজুরকে দেখতে যেতাম। কোনো সময় যেতে দেরি হয়ে গেলে যাওয়ার পর সাহেবজাদা মাওলানা মাহমুদ হাসান বলতেন, আব্বাজান কয়েকদিন থেকে আপনার কথা জিজ্ঞেস করছেন। অনেক সময় দেখেছি যখন থেকে হুজুর আমার কথা জিজ্ঞেস করতেন। সে সময় থেকে হুজুরের কথাও আমার বেশি বেশি মনে পড়ত। হুজুরকে দেখতে যাওয়ার জন্য মন উদগ্রীব হত।

একবার সাহেবজাদা মাওলানা মাহমুদ হাসান আমাকে বলেন, আব্বার সাথে আপনার বেশ সম্পর্ক আশা করি আব্বা আপনার কথাকে গুরুত্ব দিবেন। আব্বাকে বলেন, আমাকে লন্ডনে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বা অনুমতি দিতে। আমি কথা প্রসঙ্গে একদিন হুজুরের কাছে তা বললে হুজুর জবাবে বলেন, মাওলানা আমি লন্ডনে গিয়েছি। আপনি যাননি। আমি ওখানের অবস্থা স্বচক্ষে দেখে এসেছি। আমি কখনো আমার নিজের কাউকে যাওয়ার অনুমতি দিতে পারব না। এর কয়েক বৎসর পর মাওলানা মাহমুদ আবারো আমার মাধ্যমে লন্ডনে যাওয়ার অনুমতি চাইলে হুজুর বলেন, কোনো ধরনের মিথ্যার আশ্রয় না নিয়ে নিজ দায়িত্বে গেলে যেতে পারেন, কিন্তু এ ব্যাপারে আমি কোনো সাহায্য করতে পারব না বা কাউকে কোনো কিছু বলতে পারব না। তখন ফটো পরিবর্তন করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে লন্ডন যাওয়া হত—তাই এ শর্তারোপ করেন।

হুজুর ২০০৫ সালের ২৬ এপ্রিল পড়ে গিয়ে কোমরের হাড় ভেঙ্গে শয্যাশায়ী হন। ওই দিন সকালে মাদরাসার চাঁদার জন্য হুজুর বৃষ্টির মধ্যে বের হয়েছিলেন। কারণ এর আগের দিন মজলিসে ইলমিতে নাজিম সাহেব হুজুর তাঁকে বলেছিলেন, মাদরাসার এ আর্থিক সংকটকালে হুজুর কিছু চেষ্টা করলে গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে গিয়ে বললে মানুষ হয়ত কিছু চাঁদা দিবে। হুজুর তো সব সময় মাদরাসার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করতেন, এরপরও নাজিম সাহেব হুজুরের কথায় পরের দিন ফজরের নামায পড়েই গ্রামে বেরিয়ে পড়েছিলেন। মাদরাসায় ফেরার পথে ঘটে বিপত্তি। হুজুর পা পিছলে পড়ে যান। ঘটে যায় সেই দুর্ঘটনা, স্থায়ীভাবে তাকে আশ্রয় নিতে হয় বিছানায়।

বিভিন্ন সময় হুজুরকে দেখতে গিয়ে শরীরের অবস্থা জিজ্ঞেস করলে বলতেন, আলহামদুলিল্লাহ। আল্লাহ্ যে অবস্থায় রেখেছেন ভালো। আমা থেকে আরো খারাপ অবস্থায়তো অনেক লোক রয়েছে। আমি আল্লাহর কত নেয়ামত ভোগ করছি। কিন্তু তাঁর কোনো শুকরিয়া আদায় করতে পারছি না। আমার জন্য আল্লাহর কাছে দুয়া করবেন।

আমার ধারণা— মানুষ হিসাবে তাঁর থেকে যেসব ত্র“টি-বিচ্যুতি হয়েছিল আল্লাহ্ পাক অসুস্থতার মাধ্যমে তাঁকে পাক-সাফ করে নিজের কাছে নিয়ে যান। মৃত্যুর দিন পর্যন্ত হুজুরের হুঁশ-বুদ্ধি পুরোপুরি ভালো ছিল। মারাত্মক অসুস্থ অবস্থায়ও তাঁর কাছে গেলে যখন আলোচনা করতেন তখন তাঁকে সম্পূর্ণ সুস্থ বলে মনে হত।

আমার জীবনে যে কয়টি মৃত্যু আমাকে তুমুল নাড়া দিয়েছে, মারাত্মকভাবে ব্যথিত করেছে। মানষিকভাবে প্রচণ্ড আঘাত পেয়েছি—সেগুলোর অন্যতম হচ্ছে হুজুরের ইন্তেকাল আর আমার ছোট ভাই মরহুম মাওলানা বদরুযযামানের মৃত্যু। আল্লাহ্ সবাইকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন- আমিন।

লেখক: ফাযিল জামেয়া আঙ্গুরা

পরিচালক, জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট

Faridabad Jamia Sylhet

"সন্তান আপনার দায়িত্ব আমাদের" জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট الجامعة الإسلامية فريد آباد سلهت بنغلاديش

You may also like...