শায়খ আবদুল হাই রাহ. যেভাবে মাহে রামাযান অতিবাহিত করতেন

 

আতীকুর রহমান: শায়খ আবদুল হাই রাহ. ছিলেন আকাবিরের বাস্তব নমুনা। যিনি স্বীয় জীবনে আকাবিরের পূর্ণ অনুসারী ছিলেন। তাই আকাবিরের মতই পবিত্র রামাযানের খুবই ইহতেমাম করতেন এবং ইত্তেবায়ে সুন্নাতের পূর্ণ চেষ্টা করতেন। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহ তায়ালার ওপর ঈমান রেখে সওয়াবের নিয়তে রোযা, এবাদতের মাধ্যমে রাত্রিসমূহকে যিন্দা রাখে, তার অতীতের সব গোনাহ মাফ হয়ে যায়।” সুবহানাল্লাহ! হযরত শায়খ আবদুল হাই রাহ. ছিলেন হাদিসে রাসূলের বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বৃহত্তর সিলেটের প্রাচীনতম বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেউলগ্রাম মাদরাসায় শিক্ষকতার মধ্য দিয়ে শায়খের কর্ম জীবনের সূচনা হয়। পাশাপাশি আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদের ইমামও ছিলেন। তাঁর জীবন তরীর দীর্ঘ ৫৫টি বছর অতিবাহিত করেছেন এই মসজিদের ইমাম ও খতীব হিসাবে। ঐতিহ্যবাহী এই এলাকার প্রবীন মুরব্বীয়ানদের কাছ থেকে হযরত শায়খের রামাযানুল মুবারকের মামুলাত সম্পর্কে প্রাপ্ত তথ্যমতে জানা যায়—হযরত রাহ. প্রায় বছরই রামাযানের প্রথম থেকে নফল এতেকাফের নিয়তে মসজিদের বাসিন্দা হয়ে যেতেন। শায়খের জীবনে রামাযান ছিল যেন এবাদত উৎসবের মাস, সংযমের মাস, আত্মশুদ্ধির মাস, নফল নামায ও তিলাওয়াতে কুরআনের মাস। সকাল-সন্ধ্যা শুধুই এবাদতে মগ্ন থাকতেন। ফজরের নামায শেষে ইশরাক পর্যন্ত প্রভুর ঘরেই প্রেমময়ের ধ্যানে মগ্ন থাকতেন নীরবে। সে হিসাবে প্রতিদিন সকাল বেলা আরামের ঘুমকে হারাম করেই ইশরাক নামায আদায় করতেন যথারীতি। এবার শুরু হত কালামুল্লাহর তিলাওয়াত। আর কোনো বিরতি ছাড়াই তা একটানা যুহর পর্যন্ত চলত। মাটির সৃষ্টি ফেরেশতা সূরত এই আহলুল্লাহ যেহেতু জামিয়া মাদানিয়ার জিম্মাদার ছিলেন, তাই নামাযে যুহর শেষ করে কখনো কখনো মাদরাসার প্রয়োজনে বাইরে যেতেন, নতুবা আবারো সেই কুরআন তিলাওয়াতে মশগুল হতেন। এরপর বিকাল ৩টা থেকে আসর পর্যন্ত সময়টুকু বিশ্রামের জন্য বরাদ্দ ছিল। বাদ নামাযে আসর মসজিদের মুসল্লিয়ান সমেত বসতেন তিলওয়াত শ্রবণে। দৈনন্দিন রুটিন মত হাফিয সাহেবগণ কুরআনে কারীম তেলাওয়াত করে শোনাতেন। এভাবে মসজিদের ভিতরে যিকরে এলাহিতে ইফতারের সময় হয়ে যেত। ইফতার পরবর্তী মাগরিবের নামায শেষে হযরত শায়খ রাহ. একটানা তারাবির নামায আদায় করতেন হাফিয সাহেবের পেছনে। এক দিকে সারাদিন রোযা, অপরদিকে তিলাওয়াত, যিকর ও নফল নামাযে দীর্ঘ সময় কাটানোর ক্লান্তি। তাই তারাবিহ থেকে ফারেগ হয়ে খানা খেতেন। হযরত শায়খ রাহ. একজন প্রকৃত আহলুল্লাহ ছিলেন। কুতবুল আলম সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি রাহ.-এর অন্যতম খলিফা শায়খ আবদুল মতিন চৌধুরি রাহ. শায়খে ফুলবাড়ির কাছ থেকে সুলুক ও তাসাওউফের ইযাযতপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাই রামাযানের প্রতি রাত্রে বাদ তারাবিহ খানা শেষে আপন শায়খ ও মুর্শিদের বাতানো তাসবিহ আদায়ের পর নিদ্রায় যেতেন। আবার শেষরাত্রে তাহাজ্জুদের সময় বিছানা ছেড়ে ওঠে যেতেন। যেহেতু হযরত শায়খুল ইসলাম মাদানি রাহ. (বেলা তাদায়ী অর্থাৎ ঘোষণা ছাড়া) তাহাজ্জুদের নামায জামাতে আদায়ের পক্ষে ছিলেন—তাই হযরত শায়খ রাহ.-ও যথারীতি তাহাজ্জুদের নামাযে দাঁড়িয়ে যেতেন। হযরতের কণ্ঠস্বর ছিল খুবই সুন্দর। তাই মধুর কণ্ঠে তিলাওয়াত করতেন নামাযে। এ দিকে একে একে শায়খের পেছনে তাহাজ্জুদের নামাযে বিশাল জামাত হয়ে যেত। তাহাজ্জুদ শেষে কান্নাজড়িত কণ্ঠে দীর্ঘ সময় ধরে মহান প্রভুর দরবারে মুনাজাত করতেন। হযরত শায়খের জীবনে বিশেষত রামাযানুল মোবারকে সবচেয়ে প্রিয় আমল ছিল তিলাওয়াতে কুরআন। প্রতি দিন গড়ে কুরআন কারিম এক খতম করতেন। এই আমল কখনও ত্যাগ করেন নি। রামাযানে কেউ সাক্ষাতে এলে অতি সংক্ষিপ্ত সময়ে কুশল বিনিময় ও জরুরি কথা সেরে আবার মগ্ন হতেন কুরআন  তিলাওয়াতে। জীবনের শেষ পাঁচটি বছর জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে নিজ বাড়িতে শয্যাশায়ী ছিলেন। চলাফেরা তো দূরের কথা, স্বেচ্ছায় নড়া চড়াও করতে পারতেন না। এমনি অবস্থায় কুরআনে করীম মেলে ধরে তিলাওয়াত ছিল অসম্ভব। তাই সাহেবজাদাগণ কুরআনে কারীমের পৃথক পৃথক পারা এনে দিলেন। হযরত শায়খ রাহ. এমন কঠিন অবস্থায় থেকেও প্রায় ৬/৭ খতম অনায়াসে শেষ করতেন। তাহাজ্জুদের সময় পরিবারের সকল সদস্যকে সাথে নিয়ে মোনাযাত করতেন দীর্ঘ সময়। এভাবেই পুরো রামাযান অতিবাহিত করতেন তিনি। হযরত শায়খের বিশ্বাস ছিল তাহাজ্জুদের নামায ব্যতীত কোনো মানুষ আল্লাহর ওলি হতে পারে না। প্রভুর সান্নিধ্যে যেতে পারে না। ঐতিহাসিক এ মহাসত্যের বিশ্বাসী হওয়ায় তিনি ছিলেন সেই সৌভাগ্যবান—ব্যক্তি জীবনের শেষ রাত্রিও তাহাজ্জুদ পড়ার সৌভাগ্য হয়ে ছিল যাঁর। আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর প্রকৃত উত্তরসূরি হওয়ার তাওফিক দান করুন—আমীন।

লেখক: ফাযিল জামিয়া আঙ্গুরা

মুহতামিম, দারুস সুন্নাহ মুরাদগঞ্জ টাইটেল মাদরাসা

Faridabad Jamia Sylhet

"সন্তান আপনার দায়িত্ব আমাদের" জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট الجامعة الإسلامية فريد آباد سلهت بنغلاديش

You may also like...