শিশুরা বেড়ে উঠুক মুক্ত বাতাসে

আবদুল কাদির

সন্তানাদি আল্লাহর পক্ষ হতে বিরাট নিয়ামত। কেউ কেউ অনেক আশা-আকাক্সক্ষা থাকা সত্ত্বেও এই নিয়ামত থেকে বঞ্চিত থাকেন। আল্লাহ যাদের প্রতি অনুগ্রহ করেন, তাদেরকে এ নিয়ামত দিয়ে পরিতৃপ্ত করেন। প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে পৃথিবীতে হাজারো শিশুর আগমন ঘটে। এই আগমনপ্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেলে পৃথিবী জনমানবহীন অরণ্যে পরিণত হয়ে যেত। বলতে গেলে, আগত-অনাগত শিশুদের জন্যই এই সুন্দর আকাশ। নির্মল বাতাস। সবুজ-শ্যামল প্রকৃতি। এজন্যই তাদেরকে বলা হয় জাতির ভবিষ্যৎ। আগামীর কর্ণধার।
শিশুদেরকে সঠিক ও বিশুদ্ধ দীক্ষা দিয়ে গড়ে তোলা প্রত্যেক মা-বাবা তথা অভিভাবকের অবশ্য কর্তব্য। পবিত্র কুরআন বলছে, “জাহান্নামের আগুন থেকে নিজে বাঁচো এবং নিজের পরিবার-পরিজনকে বাঁচানোর ব্যবস্থা করো।” অন্য আয়াতে আল্লাহ তাঁর রাসুলকে নির্দেশ দিচ্ছেনÑ “নিজের নিকটাত্মীয়দের সতর্ক করো।” বলার অপেক্ষা রাখে নাÑ সন্তানাদি পরিবার-পরিজনের অন্যতম সদস্য। ঘনিষ্ঠ নিকটাত্মীয়দের অন্তর্ভুক্ত। তাদেরকে সঠিক শিক্ষা না দিলে বিচারদিবসে জবাবদিহি করতে হবে। রাসুল বলছেন, “তোমাদের প্রত্যেক এক একজন কর্ণধার। সবাই নিজ নিজ অধীনস্থ সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে। ব্যক্তি তার পরিবারের কর্ণধার। তাকে তার পরিবার সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে…।” সুতরাং মা-বাবার উচিত প্রতিটি সন্তানকে প্রকৃত মানুষরূপে গড়ে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা করা।
মানুষরূপে গড়ে তোলার এই প্রচেষ্টা হতে হবে নিখাদ আন্তরিকতা, পরম ভালবাসা ও মমতামেশানো পন্থায়। দয়া, আদর ও স্নেহ-মমতার মাধ্যমে। চরম কঠোরতা, রূঢ়তা এবং অতিবাড়াবাড়ি মোটেও কাম্য নয়। ছেলেকে মাদরাসায় পড়াবেন, স্কুলে পড়াবেন, আলেম বানাবেন, হাফেজ বানাবেনÑ ভালো কথা। কিন্তু সেখানে যদি অতি-বাড়াবাড়ি হয়ে যায়, তা হলে সেটি হবে অনধিকারচর্চা। সন্তানের প্রতি জুলুম। অবিচার। যে অধিকার শরিয়ত আমাকে-আপনাকে দেয় নি। আল্লাহ বলছেন, “ধর্মের বেলায় কোনো প্রকার বাড়াবাড়ি ঠিক নয়।” এই আয়াতের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায়, সন্তানকে আলেম-হাফেজ হতে অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করাও এক প্রকার বাড়াবাড়ি। দেখা যায়, অনেক অভিভাবক সন্তানকে শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে বলেন, আমার ছেলেকে যেকোনো কিছুর বিনিময়ে আলেম বানিয়ে দিতে হবে। হাফেজ বানিয়ে দিতে হবে। হাড্ডি-মাংসের দরকার নেইÑহাড়গুলো আমাকে ফেরত দিলেই চলবে। অথচ হাফেজ হওয়া, আলেম হওয়া সবার জন্য আবশ্যক নয়। শরিয়তের বিধিবিধান পুঙ্খানুপুঙ্খুভাবে জানা সবার জন্য আবশ্যক নয়। নিত্যপ্রয়োজনীয় বিধি-নিষেধ সম্পর্কে সম্যক জ্ঞানার্জনই একজন মানুষের জন্য আবশ্যক। তার জন্য সেটিই যথেষ্ট। কিন্তু শিশু? শিশুরা তো প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত শরিয়তেরই মুকাল্লাফ নয়। এমনকি কোনো প্রকার অপরাধকর্মের জন্যও সে দায়ী নয়। আল্লাহপাক সব মানুষকে একই মেধা, যোগ্যতা ও মনমানসিকতা দিয়ে তৈরি করেন নি। প্রতিটি মানুষকে বিচিত্র চিন্তা-চেতনা, মানসিকতা ও যোগ্যতা দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সে নিজেই নির্ধারণ করে কোন পথে সে হাঁটবে। কোন বিষয়ে তার আগ্রহ। সে হাফেজ হবেÑনাকি আলেম। ইঞ্জিনিয়ার হবেÑনাকি ডাক্তার? সেটি নির্ভর করে তার আগ্রহের ওপর। কিন্তু আমরা অতি-আবেগী হয়ে নির্দয়ভাবে তাদেরকে আমাদের ইচ্ছার বাস্তবায়নে বাধ্য করি।
এরকম অতি-আবেগ শিক্ষার্থীর মনে কঠিন প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। তাদের কোমল মনে শিক্ষাভীতি কাজ করে। প্রতিষ্ঠান ভয় পায়। শিক্ষক দেখলে আঁতকে ওঠে। ঘুমালে দুঃস্বপ্ন দেখে। মানসিক চাপে ভোগে। হীনম্মন্যতা বাড়তে থাকে। সর্বোপরি অজানা এক আতঙ্ক তাদের ভেতরে কাজ করে। অবশেষে একদিন ঝরে পড়ে ‘স্বপ্নীল ভবিষ্যৎগুলো’।
আমাদের এই মানসিকতার জন্য একা আমরা দায়ী নইÑ দায়ী আমাদের সমাজ ও শিক্ষাব্যবস্থা। সামাজিকভাবে আমরা এই মানসিকতা নিয়ে বেড়ে ওঠেছি যে, শিশুকে ‘মানুষ’ করার জন্য কঠিন হতে হবে। রূঢ় আচরণ করতে হবে। পেটাতে হবে। স্কুলে না গেলে হাত-বেঁধে গরুর মতো টেনে-হেঁচড়ে স্কুলে নিয়ে যেতে হবে। শিক্ষকের হাতে তুলে দিয়ে নির্দয়ভাবে পেটানোর মুক্ত অনুমতি দিয়ে আসতে হবে। নতুবা ছেলে মানুষ হবে না। বড় হয়ে ‘গাধা’ হবে। কোনো কাজে আসবে না। এই ভ্রান্ত মানসিকতা নিয়েই আমরা সমাজে বেড়ে ওঠি। নবি ও সাহাবাযুগের সোনালি অধ্যায়গুলোতে এই ভ্রান্ত মানসিকতা ছিল না। ছিল না শিক্ষার জন্য এত চাপাচাপি। ছিল হৃদ্যতা, ভালবাসা আর মমতামেশানো শিক্ষাদান। সাহাবিদের প্রতি রাসুলের নির্দেশ ছিলÑ بشّروا ولا تنفروا يسّروا ولا تعسّروا “শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি মানুষকে উৎসাহিত করো; ঘৃণা সৃষ্টি করো না। সহজতা অবলম্বন করো, কঠোরতা করো না।” তাই আমাদের সামাজিক এই মানসিকতা পরিহার করতে হবে।
আরো যে ভয়ঙ্কর কারণ সেটি হচ্ছে পরীক্ষা। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার অমানুষিক তাগাদা। ক্লাসে প্রথম হওয়ার একরোখা কামনা। ভালো ছাত্র মানেই পরীক্ষায় প্রথম-দ্বিতীয়-তৃতীয় হওয়া। এ-প্লাস পাওয়া। যে কারণে শিশুমনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরীক্ষা নামক অজানা ভূত ঢুকে পড়ে। বুঝেসুজে পড়ার আর কোনো সুযোগ থাকে না। বই পড়ে বৈষয়িক যোগ্যতা অর্জনের সুযোগ মেলে না। শিক্ষার উদ্দ্যেশ্য ছিল মেধার বিকাশ। উদ্দেশ্য ছিল পৃথিবীর বিপুল রঙে-রসে শিশুকে আগ্রহী করে তোলা। প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা। সব বুঝেসুজে একসময় যাতে সে নিজেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে তার কর্মক্ষেত্র কী এবং কোথায় হবে? আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এই ‘আগ্রহী করে তোলার’ কাজে একেবারেই ব্যর্থ। অভিভাবকরাও এই অনর্থক প্রলোভনে বিমুহিত। আহ্লাদিত। ইউরোপ-আমেরিকা তথা উন্নতবিশ্বে প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় পরীক্ষার কোনো চাপ নেই। এমনকি এশিয়ার জাপানেও ১০বছরের আগে কোনো পরীক্ষা নেই। নেই শ্রেণিকক্ষে পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার অমানুষিক তাগাদা। কিন্তু আমাদের দেশ বিরল। এখানে আড়াই-তিন বছর থেকে শুরু হয়ে যায় বইয়ের গাট্টিবহন। বাচ্চা ঠিকমতো কথা বলা শেখে নিÑএদিকে শুরু হয়ে গেছে বই টানাটানি। মাসে একাধিক পরীক্ষা। বছরে অর্ধশতাধিক। অন্যদিকে হোমওয়ার্ক। বুঝে-না-বুঝে শুধু মুখস্থ করো। পরীক্ষায় ভালো নম্বর পেতে হবে! ক্লাসে ফাস্ট হতে হবে! এসব পরীক্ষার যাঁতাকলে নিষ্পেষিত আমাদের কোমলমতি শিশুরা। যে বয়সে তারা প্রকৃতির নির্মল আলো-বাতাসে মুক্তমনে বেড়ে ওঠার কথা, সেই বয়সে আমরা তাদের ওপর চাপিয়ে দিই অমানুষিক চাপ। যা শিশুমানসিকতায় বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
তা ছাড়া অযোগ্য-অদক্ষ শিক্ষক অপ্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগও এর জন্য কম দায়ী নয়। সম্প্রতি বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে ইউনেস্কোর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগ্যতাসম্পন্ন শিক্ষকের অভাবেই শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষকপ্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় সব চেয়ে পিছিয়ে আছে বাংলাদেশ। প্রশিক্ষিত শিক্ষকের হার নেপালে ৯০শতাংশ; মালদ্বিপে ৭৮শতাংশ; মিয়ানমারে ১০০শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে ১২ থেকে ১৩শতাংশ। এই হল বাংলাদেশে সরকারি শিক্ষকপ্রশিক্ষণের হাল। কিন্তু মাদরাসাশিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষকপ্রশিক্ষণ নেই বললেই চলে। অথচ শিশুরা সেখানে নবির ‘উত্তরাধিকার সম্পত্তি’ নিতে আসে। জাতিকে ‘মুক্তির রাজপথ’ দেখাতে আসে!
আমরা অভিভাবকরা যদি একটু সতর্ক হই। যদি সংবরণ করতে পারি পরীক্ষায় চটকদার রেজাল্টের প্রলোভন; প্রথম হওয়ার অযাচিত আকাক্সক্ষা; মানুষ হওয়া মানেই মাদরাসায় পড়া; স্কুলে পড়ার একগুঁয়েমি মানসিকতা। তবেই আমরা শিশুদেরকে দিতে পারবো একটা নির্ভার শৈশব।
শিশুরা বেড়ে ওঠুক মুক্ত বাতাসে। প্রতিটি শিশু উদ্ভাসিত হোক একএকটি তারকা হয়ে। প্রস্ফুটিত হোক সুরভিত গোলাপ হয়ে।

 লেখকপরিচিতি
শিক্ষক, জামেয়া ইসলামিয়া ফরিদাবাদ সিলেট

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *