সীরাতুন নবী সা. এর অনবদ্যতা

লুকমান হাকিম

রাসুলুল্লাহ সা. এর ‘সীরাত’ সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, সীরাত অধ্যয়ন করা, চর্চা করা এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা সকল মুসলিম নর-নারীর ঈমানী দায়িত্ব। আল্লাহ্‌ ত’আলা এরশাদ করেছেন,
‘রাসুলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে তোমাদের জন্য উত্তম আদর্শ’ (আহযাব: ২১)।
‘সীরাতে রাসুলুল্লাহ’ বিষয়টি অনেক ব্যাপক, এর অনেক দিক রয়েছে। সর্বদিক আলোচনা করে শেষ করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আজ পর্যন্ত সীরাত বিষয়ে অনেক লেখালেখি, বয়ান-বক্তৃতা, সভা-সমিতি, সেমিনার-সম্মেলন হয়েছে। এতে কিছুর পরেও একথা বলা যায় না যে, সীরাতের ব্যাপারে লেখা-লেখি এবং প্রকাশ-প্রচারণা শেষ হয়ে গেছে। না কখনো না, বরং যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে সীরাতের বিভিন্ন দিক তার অপরূপ সৌন্দর্য নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রকাশ পাচ্ছে। সুন্দরের চেয়ে সুন্দর ব্যাখ্যা উপস্থাপিত হচ্ছে। আর কিয়ামত পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকবে ইনশাআল্লাহ। প্রসিদ্ধ সীরাত গবেষক শ্রদ্ধেয় উস্তাদ আল্লামা সাইয়েদ আবুল হাসান আলী নদভী রাহ. স্বীয় অনন্য সীরাত গ্রন্থ ‘আস-সীরাতুন নববিয়্যাহ’-র ভূমিকায় বলেছেন, মহানবী সা. এর জীবনী অন্য নবী-রাসূল ও মহামনীষীদের জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর মাঝে এক বিশাল ব্যবধান থাকা সত্ত্বেও তার জীবনীর এ অকল্পনীয় ব্যাপকতা, জটিলতা ও খুঁটিনাটি বিষয়ের এ সুবিস্তারিত বর্ণনায় তার আখলাক ও চরিত্রের অপূর্ব বিবরণ পাওয়া যায়। সীরাত ও শামায়েল গ্রন্থ সমূহ যা কিছু সংকলন ও সংরক্ষণ করে আমাদের দিয়েছে (সীরাত ও শামায়েল লেখকদের যাবতীয় প্রচেষ্টায় প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিনয়ের সাথে বলতে হয়) এটা তার সুবিশাল সীরাতের অপরূপ শোভা-সৌন্দর্যের ও সুমহান নবুওয়াতের যে পরিপূর্ণতা দিয়ে আল্লাহ্‌ পাক তাকে মহিমামণ্ডিত করেছিলেন, তার এক সামান্য ঝলকমাত্র।
১. সীরাতুন্নবীর বিশেষ একটি অংশ হ’ল শামায়েলে নববী। অর্থাৎ রাসুলুল্লাহ সা. এর শারীরিক আকার আকৃতি, চলা-ফেরা, উঠা-বসা, শয়ন-জাগরণ, খানা-পিনা, লেন-দেন, পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-ব্যবহার, মানুষের সাথে মেলা-মেশা, ইবাদত-বন্দেগী, যিকর-আযকার এবং দো’আ ইত্যাদি সর্বক্ষেত্রে তার আদত-অভ্যাস সম্পর্কে সম্যক আলোচনা। সীরাত ও শামায়েল সম্পর্কে জানার জন্য পবিত্র কুরআন মাজীদের বাস্তব রূপই হচ্ছে রাসুলুল্লাহ সা. এর চরিত্র মাধুর্য তথা পবিত্র সীরাত। উম্মুল মুমেনীন হযরত আয়েশা ছিদ্দীকা রা. কে রাসুলুল্লাহ সা. এর চরিত্র সম্পর্কে প্রশ্ন করা হ’লে উত্তরে তিনি বলেন, ‘তার চরিত্র-মাধুর্য ছিল পবিত্র কুরআন মাজীদ’।
২. সীরাত-শামায়েলের কোন একটি অংশও কোন রকমের মনগড়া বর্ণনা বা বানোয়াট কল্প কাহিনীর মুখাপেক্ষী নয়। আল্লামা নদভী রাহ. বলেছেন, ‘মহানবী সা. এর সীরাত রচনা করতে কোন প্রকার কিয়াস-অনুমান ও মনগড়া সব নিয়ম-নীতির অনুসরণ ও এর উপর নির্ভর করার আদৌ প্রয়োজন নেই, যার প্রয়োজন পৃথিবীর মহামনীষীদের ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই। কারণ মহানবী সা. এর জীবনী আর সব মনীষীর জীবনীর চেয়ে পরিপূর্ণ, ঐশ্বর্যময় ও অপরূপ শোভামণ্ডিত। উৎসমূল কুরআন পাকের তাবৎ সুস্পষ্ট বর্ণনা, ইতিহাসের অনস্বীকার্য সাক্ষ্য, তার আখলাক-চরিত্রের খুঁটি-নাটি বিষয়ের সুবিস্তারিত বর্ণনা বিদ্যমান, যার অধিক কল্পনা করা যায় না’।
৩. তিক্ত হ’লেও সত্য যে, হাদীছে রাসুলের অন্যান্য বিষয়ে যেমন কুতললবীরা অনেক মনগড়া কল্পকাহিনী ও বানোয়াট কথা-বার্তার উন্মেষ ঘটিয়েছে, তদ্রূপ সীরাত-শামায়েলের ব্যাপারেও অনেক জাল-মওযু কথা-বার্তা লোকালয়ে ছড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে। তাই বলি যাচাই-বাছাই করে রাসুলুল্লাহ সা. এর ছহীহ-শুদ্ধ সীরাত সংরক্ষণ করা এবং নির্ভেজালভাবে তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া সময়ের সুমহান দাবী এবং বিজ্ঞ আলেম-ওলামার গুরুদায়িত্ব।

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *