বিলাল আহমদ ইমরান

শিক্ষকতা। এক মহান ব্রত। মহান এ জন্যেই, শিক্ষক একান্ত নিষ্ঠা ও প্রাণান্ত শ্রমে যে কাজ করে চলেন দিনের পর দিন, বিরামবিহীন—সে তাঁর কাজ নয়; নিখিল মানুষের। শিক্ষক কখনো ঘুমিয়ে পড়েন না—সতত জেগে থাকেন, কেবল জাগাতে থাকেন। সত্তার জমিন চাষ করে স্বপ্নের বীজ বুনেন। সুন্দরের স্বপ্ন। জীবনের স্বপ্ন। অন্ধকারের বন্ধ দুয়ারে ব্যাকুল কর হেনে ভেতরের মানুষকে জাগিয়ে তোলার স্বপ্ন। মানুষ জাগছে, কারণ তার হাত ধরে আছেন শিক্ষক। মানুষ ছুটছে, আলোকিত জীবনের দিকে ছুটছে—কেননা তার সম্মুখে চলেছেন শিক্ষক। মানুষ মানুষ হয়ে উঠছে, উঠতেই হবে—কারণ শিক্ষক তার চেতনার কেন্দ্রে পৌঁছে দিয়েছেন মহাজীবনের বারতা।

এ তেমনই এক স্বপ্নকর শিক্ষকের গল্প—যাঁর ভুবনে শিক্ষা ও শিক্ষার্থী ছাড়া আর কিছুই ছিল না। কিংবা একজন মিস্ত্রির গল্প—যিনি শুদ্ধ সমাজ ও সভ্যতার ভিত তৈরিতে খেটে গিয়েছেন জীবনভর। এ এক মহান পরিচায়কের কথকতা—যিনি আমার নিভৃত ‘আমি’কে চিনিয়ে দিতে চেয়েছেন। সত্যের ছায়ায় নির্মাণ করেছেন এক টুকরো প্রশান্ত আঙিনা, আমরা তাতে জড়ো হয়েছি, ঘুরে দাঁড়িয়েছি আত্মসত্তার মুখোমুখি।

যখন প্রাণের উদ্ভব হল, দরকার হল তার বিকাশ—তখনই শিক্ষার শুরু। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেই তাকে শেখাতে লাগলেন। মানুষ ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল, সেই সঙ্গে শিক্ষাও। নবীরা এলেন শিক্ষক হয়ে, যুগে যুগে। সে শিক্ষাবোধের সঞ্চার ও চেতনার জাগৃতির শিক্ষা। জীবনের লক্ষ্য ও তাৎপর্য উপলব্ধির প্রয়াস। মনুষ্যত্বের মূল্য অবধারণের চেষ্টা। শুধুই ইসলামের শিক্ষাদর্শন নয়, আসলে এ-ই প্রকৃত শিক্ষা। চেতনা-লক্ষ্য-তাৎপর্য-অবধারণ বাদ দিয়ে যত প্রাতিষ্ঠানিকতা, সব বৃথা। এ উপমহাদেশে দুষ্টুরা দু’শ বছর শিক্ষাকে প্রথায় নামিয়ে এনেছে। আত্মার জায়গায় বস্তু হয়েছে জ্ঞেয়। আমরা এ প্রথারই সেবা করছি। কিন্তু প্রথা কি শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ্কে জন্ম দিয়েছে, কোনোকালে?

কওমি মাদরাসাগুলো ঐশী মৌল ও প্রথাগত যৌগের এক শংকর রূপ। তবে তার শিক্ষার মূল লক্ষ্যে কোনো কুয়াশা নেই। এ ইতিবাচকতা সম্বল করে মাদরাসাগুলো এখনো মানুষ তৈরির কাজ করছে।

শায়খ আবদুল হাই সে কর্মধারারই এক সফল কর্তা। আদর্শ শিক্ষক এবং প্রাজ্ঞ শিক্ষা সংগঠক, দু’ ক্ষেত্রেই তিনি একজন কীর্তিমান ব্যক্তি। জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের মতো বড়ো একটি প্রতিষ্ঠানের নির্মাণ, ব্যয়ভার সঙ্কুলান, পরিচালনা ও উন্নয়নে তাঁর নিরলস শ্রম ও নিষ্ঠার আখ্যান গল্পের মতোই মনে হবে। নারী ও শিশুশিক্ষার জন্যেও তিনি পৃথক মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন।

আজ এতো বছর পরে, তাঁর পাঠদানের ধরন নিয়ে যখন ভাবি, আল্লাহর রাসূলের ছায়া খুঁজে পাই। নিজে অভ্যস্ত নন এমন কোনো সদুপদেশ তিনি দিতেন না। কথা কম বলতেন, তবে বলতেন খুব গুছিয়ে। সংযম ও পরিমিতিবোধ রক্ষার পাশাপাশি জিজ্ঞাসিত বিষয়ে পূর্ণ ধারণা দিতে চেষ্টা করতেন; সংশ্লিষ্ট বিষয়ে সম্ভাব্য অন্য প্রশ্নগুলোও নিজেই উত্থাপন করে উত্তর দিতেন সাবলীলভাবে। রসিকতা করে কঠিন বিষয়ও প্রাণবন্ত করে তুলতেন। শব্দবিশ্লেষণে খুবই পারদর্শী ছিলেন। কখনো অপ্রাসঙ্গিক কিছু বলতেন না। ছাত্রদের আগ্রহের প্রতি লক্ষ রাখতেন। রাসূলচরিত ‘শামাইলে তিরমিযী’ কিতাবটি পড়েছি তাঁর কাছে, ব্যাখ্যাসাপেক্ষ গ্রন্থ—কিন্তু তাঁর একটানা বক্তৃতা শুনতে শুনতে কখনো বিরক্ত হয়েছি বলে মনে পড়ে না।

কোনো ছাত্র অসুস্থ শুনলে তিনি নিজেই দেখতে ছুটে আসতেন, এমনকি বার্ধক্যে নুয়ে পড়া বয়সেও। ছাত্রদেরকে নিজের সন্তান ভাবতেন। এমন স্নেহপরায়ন শিক্ষা-পিতার জন্যে আমাদের শ্রদ্ধানত হৃদয় উৎসর্গিত হোক। হে আল্লাহ, তাঁকে অনন্ত জীবনে অফুরন্ত শান্তি দাও।

লেখক

ফাযিলে জামিয়া

নাযিম, শাহবাগ জামিয়া মাদানিয়া ক্বাসিমুল উলূম

 জকিগঞ্জ, সিলেট