ফখরুদ্দিন আহমদ ছাদিক: ইমাম একটি আরবি শব্দ, তার আভিধানিক অর্থ হল- নেতা, আদর্শ ব্যক্তি, পথ নির্দেশক, অনুসরণীয় ব্যক্তি, রাষ্ট্রপ্রধান। এক বচনে ইমাম বহুবচনে আইম্মা। এ শব্দটি কুরআনে একবচনে ছয় বার ও বহুবচনে পাঁচ বার ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তব জীবনে পারিভাষিক অর্থে ৪টি ক্ষেত্রে ইমাম শব্দের প্রয়োগ ও ব্যবহার পাওয়া যায়।

১. জামাতে অনুষ্ঠিত সালাত পরিচালনাকারীকে ইমাম বলা হয়।

২. মুজতাহিদ; যারা কুরআন-হাদিস গবেষণা করে শরিয়তের বিধি-বিধান, নিয়ম-পদ্ধতি আবিষ্কার করেন।

৩. ইসলামের কোনো একটি বিষয়ে পাণ্ডিত্য অর্জনকারী, চুড়ান্ত পর্যায়ের অভিজ্ঞ ও গবেষক ব্যক্তিকেও সেই বিষয়ের ইমাম উপাধিতে ভূষিত করা হয়। যেমন হাদিস সংকলনকারী সবাইকে হাদিসের ইমাম বলা হয়।

৪. যেকোনো মুসলিম রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর ব্যক্তি বা রাষ্ট্রপ্রধানকেও ইসলামি পরিভাষায় ইমাম উপাধিতে আখ্যায়িত করা হয়। এ চারপ্রকার ইমামগণই নিজ নিজ অধীনস্থ ও সাধারণ জনগণের নেতা।

শায়খ আবদুল হাই রহ. এর ইমামতিতে যোগদান

শায়খ আবদুল হাই রহ.এর ছাত্রজীবন এখনও শেষ হয়নি। তিনি ১৯৫১-১৯৫৩ ইংরেজি সনে গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদরাসার ফাজিল ১ম বর্ষের ছাত্র। ছাত্রজীবনেই তিনি ঐতিহ্যবাহী আঙ্গুরা মুহাম্মপুর গ্রামের ঐতিহ্যবাহী জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব হিসাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। জুমার দিন সালাত পূর্ব বয়ানে এমন সারগর্ব, গুরুত্বপূর্ণ আলোচনানা করতেন—শ্র“তারা হতবাক হয়ে যেত। তাঁর বয়ান পরবর্তী খুতবা পাঠ ও সালাতে সুললিত কণ্ঠে কুরআন পাকের তিলাওয়াত শুনে গ্রামের সবাই খুশিতে বিমোহীত হত। তিনি যে সর্বাপেক্ষা বিশুদ্ধ তিলাওয়াতকারী, তাঁর কণ্ঠ যে হযরত দাউদ আ.এর কণ্ঠ সদৃশ সুন্দর। আকষর্ণীয় ও মনোমুগ্ধকর এর জ্বলন্ত প্রমাণ ১৯৭৯ সাল মুতাবিক ১৪০০ হিজরি সনে আযাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় পরীক্ষার সময় রানাপিং মাদরাসা মসজিদের জুমআার খুতবা ও নামাযে কুরআন পাকের তিলাওয়াত সবাইকে বিমোহিত করে তোলে। নামায শেষে সবাই তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ভিড় জমায়। আমি তখন উক্ত কেন্দ্রে বাহাদুরপূর জালালিয়া মাদরাসা থেকে মুতাওয়াসসিতা ৪র্থ বর্ষের পরীক্ষার্থী। রানাপিং বাজার ও পরীক্ষা-কেন্দ্রে তিনিই ছিলেন মধুর সুরে তিলাওয়াতকারী হিসাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। উল্লেখ্য তিনি বোর্ডের পক্ষ থেকে পরীক্ষা কেন্দ্রের পরিদর্শক হিসাবে এসেছিলেন।

শায়খ আবদুল হাই রহ. একজন আদর্শ ইমাম ছিলেন

শায়খ আবদুল হাই রাহ. একজন আদর্শ ইমাম ছিলেন। এর জ্বলন্ত প্রমাণ আজীবন তিনি একই মসজিদের ইমাম ছিলেন। ইমামতির দায়িত্ব এত স্পর্শকাতর যে গ্রাম ও মহল্লায় কোনো এক ব্যক্তির আপত্তির মুখে ইমামতি হারাতে হয়। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার! তাঁর দীর্ঘ জীবনের ইমামতিতে কোনোদিন কারো মনে বিন্দু পরিমাণ আঘাত বা কষ্ট হয়—এমন আচরণ তাঁর নিকট থেকে প্রকাশ পায়নি। সে জন্য তিনি সকলের নিকট মাথার তাজ হিসাবে বরণীয় ও গ্রহণীয় ছিলেন। তিনি যে শুধু মসজিদের ইমাম ছিলেন তা নয়, তিনি ছিলেন গোটা এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ইমাম। বিচার মীমাংসা করার একমাত্র নির্ভরযোগ্য আশ্রয়স্থল। সকল স্থানে সকল ঝগড়া-বিবাদ মীমাংসায় সকলের নিকট তিনি ছিলেন মধ্যমণি; সমানভাবে গ্রহণযোগ্য। তিনি ছিলেন গোটা এলাকার নির্লোভ ও নিঃস্বার্থ এক খাদিম বা সেবক। যেমন মহানবী হযরত মুহাম্মদুর রাসুল্লাহ সা.-এর দীর্ঘ ১০ বৎসরের খাদিম হযরত আনাস রাযি. মহানবীর চরিত্র ও আদর্শ সম্পর্কে বর্ণনা করে বলেন, “আমি বিশ্বনবীর খিদমতে একটানা ১০টি বৎসর ছিলাম। এই ১০ বৎসরের মধ্যে তিনি আমাকে কোনোদিন কোনো সময় এ কথা বলেন নি যে, হে আনাস, তুমি এ কাজটি করলে কেন? বা এ কাজটি করলে না কেন? এর দ্বারা যেমন মহানবীর বদান্যতা ও মহানুভবতা প্রকাশ পায়, ঠিক তেমনিভাবে খাদিম হযরত আনাসেরও বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তা প্রকাশ পায়, তিনি যে সার্বক্ষণিক নবীজীর মর্জি মোতাবেক স্থান-কাল ও পাত্রভেদে খিদমাত করেছেন এর জ্বলন্ত প্রমাণ। অপরদিকে খাদিম হিসেবে যে কখনও ত্র“টি-বিচ্যুতি হয়নি বা তিনি দোষ-ত্র“টির ঊর্ধ্বে ছিলেন তাও নয়; দোষ-ত্র“টি, বেয়াদবি হয়েছে—কিন্তু মহানবী কোনো বিরক্তিবোধ প্রকাশ করেননি। ঠিক তেমনিভাবে শায়খ আবদুল হাই রাহ. ও তাঁর গ্রামের এলাকার ও মহল্লায় কেনো লোকের মুখ থেকে কোনোদিন কোনো সময় তাঁর ব্যাপারে কোনো কটুক্তি উচ্চারিত হয়নি; ঠিক তেমনিভাবে হযরতের মুখ থেকেও তাঁর আচরণে কোনো গ্রামের কোনো লোক কষ্ট পায়নি। এতে তাঁর মধ্যে নবী চরিত্রের আদর্শ ফুটে ওঠে বৈ কী?

শেষরাতের নির্জন আহাজারি

মানব জাতিকে আল্লাহপাক ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ উপাধি দান করেছেন। তারা একমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে; বাকি সবাই তাদের সেবা করবে। এটাই নিয়ম ও বিধান। যারা এ নিয়ম ও বিধান মেনে চলে, তারাই হয় কুরআনে বর্ণিত এবাদুর রহমান। কুরআন সুন্নার আদেশ নিষেধ তথা সালাত-সাওম, হজ-যাকাত, হালাল-হারাম মেনে যাদের ব্যক্তিজীবন,পারিবারিক, সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক জীবন পরিচালনা করে তারাই আশরাফুল মাখলুকাতের উপাধিতে ভূষিত হয়। তাঁরাই নূরের তৈরি ফেরেশতার চেয়ে বেশি সম্মানের উপযোগী হয়। যারা ‘কিয়ামুল লাইল’ তথা শেষরাতে তাহাজ্জুদ আদায়ে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহপাকের বিশেষ অনুগ্রহ কামনা করে। আল্লাহপাক তাদেরকে তাঁর ওলি ও বন্ধু উপাধিতে আখ্যা দান করেন। কোনো ব্যক্তি তাহাজ্জুদের সালাত ব্যতীত ওলী হতে পারে না। শায়খ আবদুল হাই রাহ. ছিলেন সর্বদা তাহাজ্জুদগোজার। সবাই যখন বিভোর নিদ্রায়। রাত্রি যখন নির্জন। তিনি তখন দাঁড়িয়ে যেতেন। আহাজারি করতেন। মানুষের জন্যে, দেশের জন্যে, ইসলাম ও মুসলমানদের জন্যে, সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্যে। তাঁর সাধারণ চাল-চলনে কেউই বুঝতে পারবে না তিনি যে আধ্যাত্মিক জগতের এক অখ্যাত লুকায়িত সম্রাট। তিনি গোপনে যেমন আল্লাহ্ পাকের হক আদায় করতেন ঠিক তেমনিভাবে তাঁর উপর অর্পিত দায়িত্বগুলো সযতেœ প্রকাশ্যে ও গোপনে আদায়ে সচেষ্ট ছিলেন। পারিবারিক কোনো কাজে বাড়িতে যেতে হলে এশার সালাতের পরে আমি অধমকে ডেকে বলতেন, ফখরুদ্দিন! তুমি আমার হুজরায় রাত্রে থাকবে ও ফজরের জামাত পড়াবে। এটা ছিল হযরতের চিরাচরিত নিয়ম, তিনি আমাকে নিজের ছেলের ন্যায় মহব্বত করতেন। আমি প্রায় ৪ বৎসর হযরতের খেদমাতে ছিলাম। তখনকার মসজিদের মুতাওয়াল্লি ছিলেন মাওলানা মরহুম বশির উদ্দিন রাহ.। তাঁর ইন্তকালের পর তাঁরই যোগ্যসন্তান জনাব মিসবাহ উদ্দিন সাহেব মসজিদের মুতাওয়াল্লির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আর মুতাওয়াল্লি সাহেবের ঘরেই ছিল আমার জায়গির। সেই সুবাদে হযরত আমাকে হাতের কাছে বেশি বেশি পেতেন।

একদিনের ঘটনা: একদিন এশার পর আমাকে হুজরায় রেখে বাড়িতে গেছেন। ঘণ্টা-দেড়েক পর হুজরায় ফিরে এলেন। তাঁকে দেখে আমি হতবাক। জিজ্ঞেস করলাম, হুজুর বাড়িতে যাওয়ার কথা? রাস্তায় কি কোনো দুর্ঘটনা হয়েছে? মুচকি হেসে বললেন, ফখরুদ্দিন তুমি কি করে বুঝলে? হ্যাঁ, বাড়িতে যাওয়ার পথে সাঁকোতে উঠে আমি পা ফসকে নিচে পড়ে গিয়েছিলাম, তাই আর বাড়ি যাইনি ফিরে এলাম। এরপর আমাকে বললেন, তুমি পাশের বিছানায় শুয়ে পড়ো। হুজুরের কামরায় তখন দু’টি খাট ছিল। একটি খাটের উপর পূর্ব পাশে কুতুবখানা ছিল। এ খাটে হযরতের সাহেবজাদা ভাই হুসাইন আহমদও কোনো সময় থাকতেন। হযরতের হুকুমে আমি শুয়ে পড়েছি। হারিকেনের আলো কমানো ছিল।  আমার চোখে ঘুম আসছে না। এমতাবস্থায় দেখি হযরত নিচে থেকে অযু করে এসে নামাযে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাত তখন ২টা। নামায শেষে এমন কাকুতি-মিনতি সহকারে বলতে লাগলেন যে, “হে আল্লাহ! আমাকে মাফ করে দাও। আমি বেশুমার গোনাহ করেছি। আমার গোনার কারণে পা-পিছলে নিচে পড়েছি। অথচ হাজার হাজার মানুষ এ সাঁকো পার হয়ে যাচ্ছে কেউ নিচে পড়েনি। কেউ আঘাত পায়নি। আমার গোনার কারণে আমি শাস্তি পেয়েছি আমাকে মাফ করো মাওলা…।” তারপর অশ্র“সজল নয়নে ফজর পর্যন্ত তিনি আপন প্রতিপালকের দরবারে নিজের জন্যে, পরিবারবর্গ মাদরাসার জন্যে তথা গোটা মানবজাতির জন্যে আল্লাহ পাকের নিকট দুয়া করলেন। তাঁর এ এবাদত, আরাধনা-কান্নাকাটি শুধু একরাত্রের নয়; বরং এটা তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। প্রতি রাতের আমল। আল্লাহ্ তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন।

একবিংশ শতাব্দীর মুকুটহীন আধ্যাত্মিক সম্রাট শায়খ আবদুল হাই রাহ.এর ছাত্রজীবন এখনও শেষ হয়নি; তিনি ইমামতির গুরু দায়িত্ব নিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। তাঁর কর্মজীবন যেখান থেকে শুরু সেখানেই তাঁর পরিসমাপ্তি, অর্থাৎ ছাত্রজীবনেই তিনি যেমন আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদের ইমামতির গুরু দায়িত্ব নিয়ে কর্মজীবনের সূচনা করেন। এরপর দারুল উলুম দেউলগ্রাম মাদরাসার সহকারী শিক্ষক নিযুক্ত হন। ঠিক তেমনিভাবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করে পুনরায় ১৯৫৬ ইংরেজি সনে আবার সেই মসজিদ ও একই মাদরাসায় শিক্ষকতায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৫৬ সাল থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত মোট ৫টি বৎসর সুদুর আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর থেকে দীর্ঘ পথ পায়ে হেটে যথা সময়ে মাদরাসায় উপস্থিত হয়ে অত্যন্ত পরিশ্রম করে পরিপূর্ণ এখলাস ও দক্ষতার সাথে অধ্যাপনার দায়িত্ব আঞ্জাম দিতেন। দায়িত্ব পালনে তিনি সামান্যতম ব্যতিক্রম বা ত্র“টি প্রদর্শন করতেন না। তাইতো তিনি মরেও অমর। এমন নিষ্ঠাবান মানুষের আজ প্রয়োজন। খুবই প্রয়োজন।

লেখক: ফাযিলে জামিয়া আঙ্গুরা

মুহাদ্দিস, জামেয়া কাসিমুল উলুম মেওয়া, বিয়ানীবাজার, সিলেট