শায়খ তৈয়বুর রহমান: স্বর্ণের ব্যাপারে যেভাবে স্বর্ণকারই অতি অভিজ্ঞ তেমিন আমার অতি শ্রদ্ধেয় উস্তাদ শায়খ আবদুল হাই রাহ.-কে তাঁর যুগের প্রকৃত আল্লাহর ওলিরাই ভালোভাবে চিনেছেন। আমি তাঁর নগণ্য ছাত্র। তাঁর সম্পর্কে আমি আবার কী লিখব? লিখবেন তো তাঁরা; যারা চিনেন তাঁকে; জানেন তাঁর সম্পর্কে। এর পরও হুজুরের মহব্বতে কলম হাতে নিতে হল। হুজুর অধমকে অত্যন্ত øেহ করতেন, শরহে জামি থেকে তাফসিরে জালালাইন পর্যন্ত তাঁর সবকে বসার সুযোগ পেয়েছি। এ ধরনের একজন আহলুল্লাহর দরসে বসার সুযোগ পাওয়াতে নিজেকে ধন্য মনে করি। চট্টগ্রাম হাটহাজারি মাদরসার সম্মানীত মুহতামিম আল্লামা আহমদ শফি দা. সিলেট শহরের জামে মসজিদে ইসলাহি মজলিসে একবার বলেছিলেন, হযরত গাঙ্গুহি বলেছেন, তাসাওউফের মূল মর্ম ইত্তেবায়ে সুন্নত বা সুন্নতের অনুসরণ। আমি ৩ বৎসর হুজুরকে কাছে থেকে দেখেছি। তাঁকে পেয়েছি পূর্ণ সুন্নতের অনুসারী। তখন তিনি আঙ্গুরা মুহাম্মদপরের সকলের কাছে অতি সম্মানের পাত্র। মান্যবর ইমাম। আমি পাঁচ ওয়াক্তের নামায তাঁর পেছনে আদায় করার সুযোগ পেয়েছিলাম। আমার জানা মতে হুজুর প্রত্যেক নামাযে মাসনুন কেরাত পড়তেন। আহ! কত সুমধুর কণ্ঠ এবং বা তাজবিদ তিলাওয়াত ছিল তাঁর। এখনও মনে হয় আমার কানে সেই সুমধুর তিলাওয়াতের ধ্বনি উচ্চারিত হচ্ছে। সে সময় হুজুর হাঁপানি ও অর্শ্ব রোগে খুবই কষ্ট পাচ্ছিলেন কিন্তু এমতাবস্থায় ও নিয়মিত মাদরাসার চাঁদার জন্য বা অন্যন্যা প্রয়োজনে রাত-দিন গ্রামের বিভিন্ন বাড়িতে বার বার আসা-যাওয়া করতেন। সেই সাথে ইমামতির মহান দায়িত্বও আদায় করেছেন। কোনো কোনো সময় অধমকে নামায পড়াবার আদেশ করতেন। আমার মনে হত হুজুরের জিন্দেগির মূখ্য উদ্দেশ্য ছিল একমাত্র মাদরাসা ও দ্বীনের খেদমত। এত ব্যস্ততার পরও দাওয়াত ও তাবলিগের কাজে সময় দিতেন। আসরের পর জামাত নিয়ে নিজে সাপ্তাহিক গাশ্ত করতে অনেকদিন দেখেছি। তিনি উন্নত মানের আখলাকের অধিকারী ছিলেন। হুজুর আমাদেরকে ক্লাস করাতেন। ক্লাসে কোনো ছাত্র পড়া শিখতে না পারলে কিংবা কোনো দুষ্টুমী করলে হুজুর কোনো দিন সেই ছাত্রকে গালি দিতেন না। গাধা বলে ডাকতেন না।  আমরা তো অনেক সময় রাগ করে ছাত্রদেরকে ‘ওহে গাধা’ ‘ওহে দুষ্ট’ এইসব বাক্য উচ্চারণ করে ফেলি। যদিও এগুলো দোষের কিছু নয়। কিন্তু হুজুর এমন শব্দের বদলে বলতেন—ওহে দরবেশ! ওহে আল্লাহর ওলি! ইত্যাদি। আমি আমার শ্রদ্ধেয় উস্তাদকে কখনও কারো গিবত বা সমালোচনা করতে শুনিনি। কেহ তাঁর নিকট অন্যের সমালোচনা করারও সাহস পায়নি। তিনি হযরত মাদানি রাহ.-এর অতি আদরের একজন সুদক্ষ খলিফা শায়খ আবদুল মতিন ফুলবাড়ি রাহ.-এঁর একজন বিশিষ্ট খলিফা ছিলেন। কিন্তু তিনি তা অত্যন্ত গোপন রাখতেন। কেউ তাঁকে শায়খ বলে ডাকা সম্ভব হয়নি। শায়খ বললে তিনি অত্যন্ত নারাজ হতেন।

একটি ঘটনা স্মরণ হচ্ছে। একবার মাদরাসার বাৎসরিক জলসা।  জলসার কোনো এক কাজে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। তখনকার সময় আমরা ছিলাম মাদরাসার চূড়ান্ত জামাতের ছাত্র। আমাদের এক সাথী ছিলেন। নাম আবুল কাসিম। লেখাপড়ায় যেমন ভালো ছিলেন তেমনি খোশমেযাজিতেও ছিলেন একধাপ এগিয়ে। তাঁর কণ্ঠস্বরও ছিল সুমধুর। আমরা আমাদের শ্রদ্ধেয় হুজুরের শানে একটি আরবি কসিদা সংগ্রহ করেছিলাম। কিন্তু তা পাঠ করার সাহস বা সুযোগ পাচ্ছিলাম না। একদিন গভীর রাতে মাওলানা আবুল কাসিম সাহেব আমাদেরকে নিয়ে কুশিয়ারা নদীতে নৌকায় চড়লেন। এদিকে ছিল শীতের মওসুম। সুযোগে বুঝে তিনি কবিতা পাঠ করতে লাগলেন। সেদিন আমাদের খুব আনন্দ লাগছিল। আমরা কবিতার স্বাদ উপভোগ করতে লাগলাম। হুজুরের আশ্চর্য গুণাবলিতে মুগ্ধ হয়ে আত্মহারা হয়ে যাচ্ছিলাম। এদিকে নৌকা মাদরাসার ঘাট থেকে ধীরে ধীরে হুজুরের মসজিদের সামনে এসে ভিড়ল। আমরা তখন ভাবতেই পরিনি যে, আমাদের এই শিশুসুলভ আচরণ হুজুরকে কষ্ট দিচ্ছে। মনে মনে তিনি নারাজ হয়ে বসেছেন। আমরা তো ছাত্র। ছাত্র তো ছাত্রজীবনে ছাত্রই থাকবে। তার জ্ঞান-বুদ্ধি তো ছাত্রমাখা হওয়াই স্বাভাবিক। ঘন্টাখানিক পর আমরা আপন আপন জায়গায় চলে গেলাম। পরের দিন যখন মাদরাসায় হাজির হলাম তখন আমাদের বুঝতে আর বাকি রইল না। হুজুর আমাদের ওপর নারাজ হয়েছেন। ফলে আমাদের মনে হল আজ দিন রাত হয়ে গেছে। যার দুয়া ও সন্তুষ্টি আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের সম্বল; সেই সমুদ্রের জোয়ারে ভাটা পড়ে গেছে। তখনই মনে পড়ল সেই কবিতাটি—“সুব্বাত আলাইয়া মাসাইবু  লাও আন্নাহা সুব্বাত আলাল আয়্যামি সিরনা লায়ালিয়া।” আমরা চিন্তার সাহারায় পাগলের বেশে ঘুরতে লাগলাম। তখন সেই দুরাবস্থায় যিনি আমাদেরকে কঠিন বিপদ থেকে উদ্ধার করেছিলেন। সঠিক পথের দিশা দিয়েছিলেন, তিনি হলেন আমাদের আরো এক কলিজার টুকরা যার পরিশ্রম ও দুয়া আমাদের ইহকাল ও পরকালের উন্নতির সম্বল হযরতুল আল্লাম উস্তাদুল আসাতিযাহ মুফাক্কিরে দ্বীন  শায়খ জিয়া উদ্দিন দামাত্ বারাকাতুহুম। যিনি বর্তমান  মুহতামিম ও নাজিমে তালিমাত।  হযরত আমাদের সবাইকে সাথে নিয়ে ইমাম সাহেব হুজুর রাহ. নিকট উপস্থিত হলেন আর আমরা সকল দয়ার সাগরের নিকট ক্ষমাপ্রার্থী হলাম এবং তিনি আমাদেরকে ক্ষমা করে দুয়া দিয়ে বিদায় দিলেন।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, জামেয়া আঙ্গুরা

 নাযিম, দারুস সালাম মাদরাসা, সিলেট