আবু তালহা মাহফুয: মহান আল্লাহ তায়ালা সর্বযুগে এমন কিছু মহামানব সৃষ্টি করেন যারা মরেও অমর হয়ে থাকে; যাদের বিয়োগে দুনিয়াবাসী কেঁদে ওঠে। আর তাঁরা হেসে হেসে আপন প্রেমাষ্পদের সান্নিধ্যে চলে যায়। যাদের বিরহ জ্বালায় মানুষ কাতর হয়ে পড়ে আর তাঁরা পরম আনন্দের কুল বিছানায় ঘুমিযে যায়। যাঁদের নেক আমলের ধারা বন্ধ হয়ে যাওয়াতে আকাশের দরজাগুলো পর্যন্ত হয়ে যায় শোকাহত। সে সব মহামনীষীদের সিলসিলার এক কড়ি ছিলেন আমাদের পরম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক, জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের মুদিরে মুহতারাম শায়খ আবদুল হাই রাহ.।

যিনি ছিলেন নীরব এক আল্লাহ প্রেমিক, “রূহবান ফিল লাইল ও ফুরসান ফিন নাহারে”র মূর্ত প্রতীক। তাঁর জীবনের আগা-গোড়া ছিল মানবকল্যাণে নিবেদিত। তাঁর জীবনের প্রতিটি ধারা ছিল পরবর্তীদের জন্য পাথেয় ও অনুসরণীয়। তাঁর আচার-ব্যহার ও মেহমানদারি ছিল অতুলনীয়। তাঁর øেহের পরশ যে যতটুকু পেয়েছে সেই জানে কী সম্পদ হারিয়েছে। আমি তো হযরতের শেষ যামানার ছাত্র, মনে করতাম যেন হযরত আমাকেই সবচেয়ে বেশি আদর করেন, øেহ সোহাগের মন ভুলানো কথা বলতেন। পরে দেখি, না; হযরতের হাজারো রূহানি আওলাদ রয়েছেন যারা সাবই আমার মতোই মনে করে। যে কথাটি বারবার অন্তরে উঁকি দিচ্ছে, যেটি না বললেই না হয়। একদিনের কথা। আমি ক’জন আসাতিজায়ে কেরামের সাথে হযরতের সাক্ষাতে গিয়েছিলাম। হযরত তখন রোগাক্রান্ত অবস্থায় বিছানায় শায়িত। কুশল বিনিময় ও চা নাস্তার পর যখন বিদায় প্রার্থনা করি হযরত তখন বলেন, আরেকটু বসুন, খানা খেয়ে যাবেন। আমি মৃদু হেসে বললাম, হুযুর! যারা রোগী দেখতে আসবে তাদের জন্য তো তাড়াতাড়ি চলে যাওয়া সুন্নাত। হযরত একটু মুচকি হেসে বলেন, সেটাতো আপনাদের জন্য সুন্নাত, আমার জন্য তো কিছু সুন্নাত রয়েছে।

তিনি ছিলেন দুনিয়াত্যাগী এক সাধক। তাঁর সকল শ্রম-সাধনা ছিল আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টির জন্য। তাঁর সাধনার ফল আজকের জামিয়া মাদানিয়া। যে জামিয়া আজ তাঁর ৫০ বৎসর পূর্তি ও দস্তারবন্দী মহাসম্মেলন করতে যাচ্ছে। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমে জামিয়া আজ বিশ্বজুড়া সুনাম-সুখ্যাতি কুড়াতে সক্ষম হয়েছে। তাঁর কঠোর শ্রম-সাধনার সূচনা স্কুল জীবন থেকেই শুরু। ছাত্রজীবনের প্রত্যেকটি ধাপে তিনি কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছেন। মাত্র নয় বৎসর বয়সে উন্নত শিক্ষা লাভের জন্যে বাড়ি ছেড়ে আঙ্গুরা মুহাম্মপুর চলে আসেন। তাঁর মামা হাফিজ মৌলবি আবদুল কাইয়ুম সাহেব রাহ.‘র তত্ত্বাবধানে প্রথমে কিছুদিন আঙ্গুরা মুহাম্দপুর প্রাইমারিতে লেখাপড়া করেন। এরপর দারুল উলুম দেউলগ্রাম মাদরাসায় ভর্তি হন। তিনি প্রতিদিন পায়ে হেটে আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর থেকে দেউলগ্রাম মাদরসায় ক্লাস করতেন। সেখান থেকে কিছুদিনের জন্য গাছবাড়ি আলিয়া মাদরাসায় চলে যান। তারপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্যে তিনি দারুল উলুম দেওবন্দ চলে যান। কিন্তু আল্লাহর মহিমা! একদিকে তিনি চরম অসুস্থ হয়ে পড়েন, অপরদিকে তাঁর ভিসা শেষ হয়ে যাওয়াতে তিনি দেশে ফিরতে বাধ্য হন। অবশেষে ঢাকাস্থ লালবাগ মাদরাসায় দাখেলা নিয়ে কৃতিত্বের সাথে তাকমিল ফিল হাদিস সম্পন্ন করেন।

তাঁর কর্মজীবন শুরু হয় দারুল উলুম দেউলগ্রাম মাদরাসা থেকে। তখন থেকেই তিন আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদের ইমাম নিযুক্ত হন। ১৩৮১ হিজরি মুতাবিক ১৯৬১ সালে যখন জামেয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তখন তিনিও ছিলেন প্রতিষ্ঠাতাদের অন্যতম। প্রথমে যখন মাওলানা শিহাবুদ্দিন রাহ. মুহতামিম ছিলেন তখন তাঁর কর্মদক্ষতার কারণে ইহতেমামির অনেক কাজ তাঁকেই করতে হত। কিছুদিন পর যখন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় মাওলানা শফিকুল হক আমকুনি সাহেবের ওপর তখনও তিনি তাঁর দিকে সহযোগিতার হাত সম্প্রসারিত রাখেন। অল্প কিছুদিন পর ১৩৯৯ হিজরিতে তাঁকেই গ্রহণ করতে হল মাদরাসা পরিচালনার দায়িত্ব। তখন থেকেই শুরু হয় জামেয়ার উন্নতি। তিনি আপন দায়িত্বে ছিলেন একনিষ্ঠ। এহতেমামির দায়িত্ব পাওয়ার পরপরই ১৪০০ হিজরিতে জামেয়ার হিফয বিভাগ চালু করেন। তাঁরই নিরলস প্রচেষ্টায় ১৪০৬ হিজরিতে তাকমিল ফিল হাদিস (টাইটেল ক্লাস) খোলা হয়।

একদিকে তিনি ছিলেন একজন পাঠদানকারী, বিজ্ঞ শিক্ষক, অপরদিকে আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদের ইমাম ও খতিব। সাথে সাথে মাদরাসা পরিচালনার গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত হয় তাঁর ওপর । তাই তিনি পাঠদান চলাকালীন দারস ও তাদরিসে মগ্ন থাকতেন। ছুটির পর চাঁদা কালেকশনের জন্য মহল্লায় বেরিয়ে যেতেন। নামাযের সময় ইমামতির দায়িত্ব তাঁকে মসজিদে ফিরে আসতে বাধ্য করত। নামাযান্তে আবার বেরিয়ে পড়তেন জামেয়ার কাজে।

জামিয়া মাদানিয়া একটি অজপাড়া গাঁয়ে অবস্থিত। গ্রামের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে কুশিয়ারা নদী। সাতটি গ্রাম নিয়ে এ জামেয়ার যাত্রা। লাউজারি থেকে গোবিন্দশ্রী, আর শালেশ্বর থেকে ফুলমলিক পর্যন্ত এমন কোনো পাড়া নেই যেখানে তিনি বারবার যাননি। গ্রামের ঘরে ঘরে কতবার যে ছিল তাঁর পদচারণা তার ইয়ত্তা কে দিতে পারে? তিনি ছিলেন সবার পরিচিত। তাঁর হাস্যোজ্জ্বল চেহারা দেখে মন জুড়ে যেত। তাঁর চেহারায় খোদাদাদ একটি পাওয়ার ছিল যে, যত বড় বীর সাহসী হোক না কেন—সামনে পড়লে মাথা নত করতে বাধ্য হত। তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা ও মনোমুগ্ধকর ব্যবহারে এলাকার লোকজন কেউ তাঁকে দাদা আর কেউ নানা আবার কেউ মামা বলে ডাকত। জামেয়ার একসময় এমনও ছিল যে দৈনিক বোর্ডিংয়ের খরচের জন্য দেড়/দুই শত টাকা লাগত। তিনি পূর্ণ দিন হেটে এ টাকাগুলোর যোগান দিতেন। কোনো দিন এমনও হত যে, পূর্ণদিন ঘোরাফেরার পরও শ’দুইশ টাকার যোগাড় হত না। তখন তিনি ভীষণ চিন্তিত হয়ে পড়তেন।

ছাত্রজীবন থেকে তিনি কয়েকটি রোগে আক্রান্ত ছিলেন। বিশেষত হাঁপানি রোগের কারণে কখনও রাস্তাঘাটে তিনি আক্রান্ত হয়ে পড়তেন তবুও তাঁকে মাদরাসার অফিসকক্ষে বা মসজিদের হুজরায় খুব কমই পাওয়া যেত। বেশিরভাগ সময় মাদরাসার কাজে গ্রামের অলি-গলিতে ঘুরে বেড়াতেন। জামেয়ার পুরাতন ভবনের প্রায় সবক’টি বিল্ডিং তাঁর হাতে নির্মিত। যখনই মাদরাসার কোনো নির্মাণ বা মেরামত কাজ হত তখন তিনি নিজেই মিস্ত্রীর পাশে দাঁড়িয়ে থাকতেন। নিজের সব ব্যস্ততাকে পিছনে রেখে কার্যস্থলে ঘুরাফেরা করতেন। প্রায় সময় দেখা যেত যে, হযরত আপন লাঠি দ্বারা মাপ-জোক করছেন।

১৯১৪ হিজরিতে যখন মাদরাসার সামনের নদী ভাঙ্গনের কবলে পড়ে তখন তাঁর পেরেশানি আর চিন্তা কে দেখে! তিনি একদিকে প্রশাসনের নিকট সহযোগিতার জন্য দরখাস্ত করেন এবং এলাকা থেকে বাঁশ-গাছ চাঁদা করে নদী ভাঙ্গনে একটি বাঁধ নির্মাণ করে পাথর-বালু ও সিমেন্টের বস্তা ফেলার ব্যবস্থা করেন। অপরদিকে আল্লাহ তায়ালার দরবারে ক্রন্দনের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করেন। কোনো সময় গভীর রাত্রে একা একা নদীর পারে দাঁড়িয়ে দুয়া করতেন। তখন থেকে নদী-ভাঙ্গন বন্ধ হতে শুরু করে।

নদী ভাঙ্গনের কারণে জামিয়ার পূরাতন ভবন যখন আশংকাজনক পরিস্থিতির শিকার হয় তখন তিনি মাদরাসার হিতাকাক্সক্ষী দেশবাসীকে নিয়ে বারবার পরামর্শের পর মাদরাসা স্থানান্তর করার সিদ্ধান্তে উপনীত হন। একে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে হযরত লন্ডন সফর করেন। উক্ত সফরে জায়গার মূল্যসহ প্রায় ১ কোটি টাকা চাঁদা উসুল করেন। সফর থেকে প্রত্যাবর্তনের পর জামিয়ার নতুন ভবনের ভিত্তি স্থাপন করেন। ইতঃপূর্বে মাদরাসার স্বার্থে আরো দু’বার লন্ডন সফর করেন। নতুন ভবনের পূর্ণ কাজ হযরতের তত্ত্বাবধানেই হয়েছিল। জামিয়ার প্রতিটি ইট পাথর তাঁর কঠোর শ্রম সাধনার সাক্ষ্য বহন করে। জামিয়া মাদানিয়ার উন্নতি ও অগ্রগতিই ছিল হযরতের জীবনের চরম ও পরম লক্ষ্য। তিনি সয্যাশায়ী হওয়ার পর তাঁর দৈহিক কর্ম-সাধনা বন্ধ হয়ে গেলেও আন্তরিক চিন্তা-চেতনায় কোনো ভাটা পড়েনি। তাই আসাতিজায়ে কেরামের যে কেউ তাঁকে দেখতে গেলে তিনি জামিয়ার বর্তমান অবস্থা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরতেন।

জামিয়া মাদানিয়া ছাড়াও আরো বহু মাদরাসা ও বোর্ডের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। শিক্ষকতা, অধ্যাপনা, মসজিদ মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, তাসাওউফ, ওয়াজ-নসিহত ছাড়াও সামাজিক কর্মকাণ্ডে তাঁর ভূমিকা ছিল অসামান্য। ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনকে পিছনে রেখে বা জলাঞ্জলি দিয়ে সমাজ ও প্রতিষ্ঠানের স্বার্থের প্রতি ঝাঁপিয়ে পড়াই ছিল তাঁর জীবনের সাফল্য। যে মহান ব্যক্তিত্বের জীবনের সাধনা ছিল নিজেকে লুকিয়ে রাখা, তাঁর জীবনের যথাযথ আলোচনা কার সাধ্যে? আমরা সে আল্লাহপ্রেমিক মানুষটির জন্যে দুয়া করি—মহান আল্লাহ্ যেন তাঁকে জান্নাতুল ফিরদাউসের মেহমান হিসাবে কবুল করেন। আমীন।

লেখক: শিক্ষক, জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর