নূরুদ্দীন ছোটদেশি: মহান রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য ও সান্নিধ্য লাভের লক্ষ্যে যুগ যুগ কঠোর সাধনা ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে যে সকল মহাপুরুষ পুষ্পের মতো সৌরভ ছড়িয়ে যান পৃথিবীর মাঝে যা নিঃশেষ হয় না কখনো, রেখে যান মহৎ আদর্শ ও অমর কীর্তি। তাঁরা আসলে মরেন না, স্মৃতির আয়নায় তাঁরা হয়ে থাকেন চিরভাস্বর ও অমর। তাঁদেরই মধ্যে নির্ঘণ্টে সোনার অক্ষরে লেখা একটি নাম শায়খ মাওলানা আবদুল হাই রাহ.। জীবনের প্রতিটি কদম কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে পরিচালিত করে তিনি খোদভীতি, খোদা ও রাসূল প্রেমের এক অনুপম দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। একজন সত্যিকারের ওয়ারিসে নবী হিসেবে অত্যন্ত নিপুনতার সাথে নবী সা. এর অন্যতম প্রধান দায়িত্ব—কুরআনে মাজীদের তিলাওয়াত, কুরআন-হিকমাত (হাদিস ও সুন্নাহ) শিক্ষাদান ও তাযকিয়ায়ে নাফস (আত্মশুদ্ধি) এর গুরু দায়িত্ব পালনই ছিল তাঁর সারা জীবনের একমাত্র সাধনা। কুরআনে মাজীদের তিলাওয়াত ছিল তাঁর সত্ত্বার চিরসঙ্গী। সুন্নাতে রাসূল সা. ছিল তাঁর জীবনের বেশভূষা। তাঁর পুরো জীবনটাই ছিল তায্কিয়ায়ে নাফ্স, তাক্বওয়া ও পরহেযগারি, ইখলাস ও লিল্লাহিয়াতের এক জীবন্ত নমুনা। জ্ঞান ছিল তাঁর পুঁজি, একীন ও তাওয়াক্কুল ছিল তাঁর শক্তি, বিনয় ছিল তাঁর মেজাজ, উত্তম আখলাক ছিল তাঁর সাথী। তিনি ছিলেন সালাফে সালিহীন ও আকাবিরে দেওবন্দের আদর্শ ও চিন্তাধারার একজন খাঁটি আমানতদার। সামাজিকতা, মসজিদ-মাদরাসা প্রতিষ্ঠা, পৃষ্ঠপোষকতা ও পরিচালনা, লেনদেন, সততা-বিশ্বস্থতা ইত্যাদির ব্যাপারে তিনি ছিলেন আদর্শ পুরুষ। তিনিই ছিলেন বর্তমান জামিয়ার সফল রূপকার। আঙ্গুরা মুহাম্মদপুরের ছোট্ট মাদরাসাটিকে সারাটি জীবন তিলে তিলে ক্ষয় করে ও আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটির মাধ্যমে পরিণত করেছেন একটি দ্বীনী মারকায ও জগতখ্যাত আদর্শ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। মাদরাসার স্বার্থকে নিজের স্বার্থের উপর সর্বদা প্রধান্য দিতেন। আসাতিযায়ে কেরামের প্রতি ছিল তাঁর অগাধ শ্রদ্ধা-সম্মান ও কোমল ব্যবহার আর ছাত্রদের প্রতি ছিল আন্তরিক øেহ-মমতা। ছাত্রদের লেখাপড়া, চরিত্রগঠণ ও তারবিয়াতের পাশাপাশি তাদের বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার প্রতি লক্ষ্য রাখতেন সর্বদা। শিক্ষকতার ময়দানে তিনি ছিলেন একজন আদর্শ শিক্ষক। পাঠদানে তিনি সুন্দর প্রাঞ্জল ভাষায় সাবলীল ও আকর্ষণীয় ভঙ্গিতে গুঢ়তাত্ত্বিক বিষয়াবলীর বিশ্লেষণ করতেন। উত্তিত সুক্ষè ও জঠিল প্রশ্নের উত্তর সমূহ তাঁর ব্যাখ্যায় উল্লেখ থাকত। পাঠদানে তাঁকে দেখা যেত গুরুগম্ভীর এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রেমে আপ্লুত।

তাঁর জীবনযাপন ছিল খুবই সাদাসিধে প্রকৃতির। তাঁর চাল-চলন, আচার-আচরণ, আলাপ-আলোচনা, আখলাক-চরিত্র, সরলতা ছিল একেবারে সাহাবায়ে কেরামের অনুরূপ। তিনি নিজেকে এত ছোট্ট মনে করতেন যেমন নবজাতক শিশু স্বীয় পিতা-মাতার কাছে। গর্ব-অহংকার, যশ-খ্যাতি, প্রচার-পরিচিতির নামগন্ধও ছিল না কখনো তাঁর মাঝে। ছোট-বড় সকলের সাথে তাঁর ভদ্রতা, শালীনতা, øেহ-মায়া ও শ্রদ্ধা সম্মানের বিষয়টি অতুলনীয়। তাঁর কাছে যে-ই আসত তাকে এত আপন করে নিতেন যে, সে ভাবত তাকেই তিনি সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন, øেহ করেন। মেহমানদের যথাযথ মেহমানদারী ও আপ্যায়ন ছিল তাঁর মজ্জাগত স্বভাব। নিজের শত ব্যস্ততা, অসুস্থতা ও বার্ধক্যের দূর্বলতা সত্ত্বেও যখনই কেউ নিজের কোনো সমস্যা নিয়ে হযরতের দ্বারস্ত হতেন, তাকে হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় সমাদর করে বসাতেন নিজের কাছে। প্রশস্ত আত্মার নজীরবিহীন উদারতা ও অন্তরের সরলতার কারণে তাঁর প্রতি মানুষের আকর্ষণ ছিল বর্ণনাতীত। তাঁর দ্বারা সমাজের তৃণমূল পর্যায় থেকে সর্বোচ্চ স্তর পর্যন্ত সবাই উপকৃত হয়েছেন। পরিবার-পরিজনের প্রতিটি সদস্যের প্রতি তিনি যেমন ছিলেন øেহবৎসল, তেমনি সুতীক্ষè দৃষ্টি ও দায়িত্ব-সচেতনও ছিলেন সর্বদা। আল্লাহর হক ও বান্দার হক আদায়ে খুব সজাগ ও সচেতন থাকতেন সদা। গভীর রজনীতে বিশ্ব চরাচর যখন সুপ্তির কোলে ঢলে পড়ত, তখন স্বীয় স্রষ্টার দরবারে হাযির হওয়া ছিল তাঁর নিত্যদিনের ব্যস্ততা ও অভ্যাস। যিক্র-আযকার ও তাহাজ্জুদের নামাযান্তে তিনি তাঁর স্বপ্নের জামিয়ার মকবুলিয়াত, উন্নতি-অগ্রগতি এবং মুসলিম উম্মাহর সমৃদ্ধি, ঐক্য ও সার্বিক কল্যাণকামিতায় তাঁর মাওলার দরবারে কান্নায় ভেঙ্গে পড়তেন। মুসলিম উম্মাহর সুখের সংবাদে আনন্দিত হতেন এবং দুঃখের সংবাদে হতে ব্যথিত ও পীড়িত। তিনি ছিলেন এক মুকুটবিহীন লুকায়িত আল্লার ওলী; তাঁর পিছনে কোন লোক-লস্কর ছিল না, তা পছন্দও করতেন না। তাই তাঁর বাহ্যিক রূপটি সবার সামনে থাকলেও তাঁর আভ্যন্তরীন কামালিয়াত অধিকাংশ লোকের কাছে ছিল অজানা। অভাব-অনটন, অসচ্ছলতা সর্বদা লেগেই থাকত, কিন্তু কোনো শেকায়ত ছিল না। অসুখ-বিসুখে প্রায়ই আক্রান্ত থাকতেন, কিন্তু সবর ও ধৈর্য ছিল তাঁর চির সাথী। তিনি কোনো দিনই নিজের কোনো প্রয়োজনে কারো কাছে হাত পাতেননি, হাত পাতা কিংবা চাইবার ভানও করেননি কখনো। তিনি মাদরাসা- মসজিদের বৃহত্তর স্বার্থের খাতিরেই গিয়েছেন বিভিন্ন স্থানে, নানা মানুষের কাছে। নিজ ব্যক্তিসত্ত্বা কিংবা পরিবারের স্বার্থে কখনো নয়। এক্ষেত্রে পূর্বসূরি বুযুর্গদের গৃহীত নীতি ও অনুসৃত আদর্শই ছিল তাঁর নীতি ও আদর্শ। বিত্ত-বৈভবের প্রতি অনাসক্তি ছিল তাঁর আজন্ম। বিত্তবানদের সাথে সর্বদা উঠা-বসা করেও তিনি এর প্রতি একবিন্দু আকৃষ্ট হননি। রাজহংস যেমন হৃদের পানিতে সাঁতার কাটে কিন্তু এক ফোটা পানিও তার গায়ে লাগে না, তেমনি হযরত রাহ. এর অন্তর-বাহির এমন স্বচ্ছ-শুভ্র ছিল যে, তাতে সামান্য কালো দাগের চি‎হ্ন লাগার সুযোগ পায়নি। তাঁর সত্তার চতুর্দিকে শুধুই ছিল সৌন্দর্য আর সৌন্দর্যই। সহজ কথায়—হযরত রাহ. ছিলেন উচ্চ চরিত্র-মাধুরী ও সর্বোৎকৃষ্ট গুণাবলির দ্বারা ভূষিত। জ্ঞান-প্রজ্ঞা, রুচির সুস্থতা, উপলব্ধির তীক্ষèতা, নীতি-নৈতিকতা, সততা, উদারতা, মহানুভবতা, আত্মত্যাগ, মমতা, বদান্যতা, প্রেম-ভালবাসা ইত্যাদি গুণাবলীতে অভিষিক্ত। ইখলাস ও আন্তরিকতা, ইহ্তেসাব ও পুণ্য কামনা, সবর ও ধৈর্য, আল্লাহর উপর ভরসা, জাগতিক মোহমুক্তিতা, ইস্তিগনা ও মুখাপেক্ষীহীনতা, আল্লাহমুখীতা, দুনিয়ার উপর আখেরাতের প্রধান্য দান, আল্লাহর সন্তুষ্টি ও তাঁর দিদার লাভের আকুলতা, সমস্ত সৃষ্টির প্রতি দয়া ও অনুকম্পা, দুর্বলদের প্রতি সহমর্মিতা, আবেগ ও প্রেরণার পবিত্রতা, লজ্জাশীলতা, বিনয় ও নম্রতা, নিরহংকারীতা, ক্ষমা প্রদর্শন ইত্যাদি এই সকল অসাধারণ গুণাবলীর কারণেই তিনি ছিলেন রাসূলের আদের্শর এক জীবন্ত প্রতীক, সত্যিকারের নায়েবে রাসূল। তাঁর জীবন ছিল মাকারিমের আখলাকের বাস্তব চিত্র। আয়াতে কারীমা إنما يخشى الله من عباده العلماء এর বাস্তব দৃষ্টান্ত ছিলেন তিনি। إذا رؤوا ذكر الله (আল্লাহওয়ালা তারাই যাদেরকে দেখামাত্র আল্লাহর কথা স্মরণ হয়) এই হাদিসের বাস্তব রূপ।

এই ক্ষণজন্মা মহাপুরুষের শৈশব থেকে বার্ধক্য তথা মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি কর্মই ছিল অনন্য ও শিক্ষণীয়। শয্যাশায়ী অবস্থায় বাড়িতে তাঁকে কেউ দেখতে গেলে কিছু হলেও তার সাথে কথা বলতেন, খোঁজ-খবর নিতেন, দোয়া করতেন এবং তিনি নিজের জন্যও “খাতেমা বিল খায়ের”- এর দোয়া চাইতেন। ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩১ হিজরি রোজ শুক্রবার বেলা ১.১০ মিনিটের সময় বিশ্ব চরাচর থেকে দ্বীনের এই শাশ্বত রবির অস্তগমন হয়। কবির ভাষায় বলি: “শত দুঃখ-অনুতাপ! চোখের পলকে প্রিয়ার সঙ্গ শেষ হয়ে গেল। তৃপ্তির সাথে ফুলের গন্ধ নিলাম না, বসন্তকালের ইতি ঘটলো।” হযরতের অবর্তমানে আমরা যেমন ব্যথাতুর, অশ্র“সিক্ত না হয়ে পারি না, তেমনি কেবল তাঁর স্মৃতিচারণে শ্লোক রচনা, স্মারকগ্রন্থ প্রকাশ ও আলোচনা সভার আয়োজন করাতেই কর্তব্য সম্পাদন হবে বলে মনে করতে পারি না। বরং যে স্বপ্নকে তিনি আমরণ বুকে লালন করে পুরো জীবনটাকে সাধনামূখর রেখেছেন, যে মিশনকে ফলপ্রসূ গতি দান করতে তিনি ছিলেন সদা তৎপর, যে উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে নিজের অস্তিত্বকে বিলীন করে দিবা-নিশি ছিলেন নিরলস সংগ্রামী—সে দিকটার প্রতি দৃষ্টি দেওয়াই হবে আমাদের কর্তব্য সচেতনার বড় পরিচায়ক।

দুয়া করি আল্লাহ তায়ালার শাহী দরবারে—তিনি যেন হযরত মুহতামিম সাহেব হুযূর রাহ. কে জান্নাতের উচ্চাসন দান করেন। আরো প্রার্থনা করি—তাঁর রূহানি ফয়েয ও বরকতের স্রোতধারায় অবগাহন করুক চিরকাল তাঁরই স্বপ্নের জামিয়া মাদানিয়া।

লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর