মাহমুদ হাসান: ২৬ ফেব্র“য়ারি ২০১০ ইংরেজি, মোতবিক ১১ রবিউল আউয়াল ১৪৩১ হিজরি, শুক্রবার, বেলা ১.১০ মিনিট। বাংলার আকাশ থেকে অস্তমিত হয়ে গেল এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। আশা ছিল বাংলার মানুষকে আলো দেবে আরো কয়েকদিন। কিন্তু আল্লাহর কি মহিমা! সে আশা দুরাাশায় পর্যবসিত হল। সকল আশা-আকাক্সক্ষা নিরাশায় বদলে গেল। যখন খবর পেলাম, আলোকিত সেই তারকাটি ঝড়ে পড়েছে, তখন হঠাৎ থমকে গেলাম। বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে গোটা জাতিকে গভীর অন্ধকারে ছেড়ে দিয়ে এভাবেই বিদায় নিয়ে যাবেন প্রকৃত মাওলার সান্নিধ্যে। আমি যে নক্ষত্রের কথা বলছি, তা আকাশের কোনো নক্ষত্র নয়; বরং এটি হল জমিনের উজ্জ্বল নক্ষত্র। যিনি ইলমুল ওহি ও ইলমে মারেফাতের আলো দিতেন পৃথিবীকে। উনি হলেন ওলিকুল শিরোমণি, সফল ইমাম ও মুহতামিম, উস্তাযুল আসাতিযা, উস্তাজুল মুহাদ্দিসীন ও মুফাসসিরীন, উস্তাজুল আইম্মাহ, জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর এর দীর্ঘ ৩২ বছরের সফল মুহতামিম মাওলানা শায়খ আবদুল হাই রাহ.।

হযরত মুহতামিম সাহেব রাহ. ১১ মার্চ ১৯৩২ সনে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৩৮ সাল থেকে পড়াশোনা শুরু করেন। মাথিউরা ঈদগাহ মাদরাসা থেকে শুরু করে আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর পাঠশালা এবং সেখান থেকে দেউলগ্রাম মাদরাসায় ভর্তি হয়ে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হন। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ঢাকা লালবাগ মাদরাসা, গাছবাড়ি মাদরাসা ও দারুল উলুম দেওবন্দে  অধ্যয়ন করেন এবং যুগশ্রেষ্ঠ আলিম উলামাগণ হতে ইলমে জাহিরি অর্জন করেন। ইলমে তরিকত অর্জন করেন হযরত মাদানি রাহ. এর অন্যতম খলিফা হযরত আবদুল মুতিন, শায়খে ফুলবাড়ি রাহ. থেকে।

অল্প কিছুদিন হলেও আমি অধম তাঁর সুহবত গ্রহণ করেছিলাম। আমি তাঁকে স্বচক্ষে অবলোকন করেছি। তাঁর চাল-চলন কথাবার্তা, আচার-ব্যবহার, উঠা-বসা, দারস ও তাদরিসসহ অনেককিছু কাছে থেকে দেখেছি। দেখেছি তাঁর ইবাদত বন্দেগিও। সবকিছুতেই ছিল সুন্নতে নববির বাস্তব রূপ। তাঁর কথাবার্তা ছিল নম্র ও মধুর। তাঁর মতো নম্র-ভদ্র ও অমায়িক এবং সুন্নাতের পাবন্দ লোক অনেক কম দেখেছি। তিনি আমার শামায়িলে তিরমিযি নামক কিতাবের উস্তাদ। তাঁর দারস ছিল অত্যন্ত সুমধুর ও সহজ। অতি সহজে প্রয়োজনে কোনো উপমা দিয়েও কঠিন থেকে কঠিন বিষয়কে বুঝিয়ে দিতেন। শামায়িল পড়ানোর সময় বুঝা যেত যে, তিনি রাসূল সা.কে দেখে দেখে পড়াচ্ছেন। দারসের ফাকে ফাকে কেনো বিষয় প্রসঙ্গে এমন কিছু ইঙ্গিতমূলক কথা বলতেন, তাও কিছু বলে থমকে যেতেন, এবং সাথে সাথে চোখের পানি গড়িয়ে পড়ত, মাথার রুমাল দ্বারা চোখের পানি মুছতেন। বুঝা যেত রাসূল সা. এর ইশক ও মুহাব্বাতে হৃদয় ফেটে যাচ্ছে। দুই-এক মিনিট সময় দারস বন্ধ থাকতো। এতে আমি স্পষ্টভাবে বুঝতাম, আগের রজনীতে স্বপ্নযোগে রাসূল সা. এর দর্শন লাভ করেছেন। দুই-একটি স্বপ্ন পরিষ্কার ভাষায় উল্লেখও করেছেন।

আমার দেখামতে হযরত মুহতামিম সাহেব রাহ. এর মধ্যে ছিল রাসূল সা. এর পূর্ণ উসওয়াহ। তাঁর মাথা থেকে পা পর্যন্ত সবকিছুতেই ছিল রাসূল সা. এর পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, চলার পথে রাস্তায় মাথা নিচু করে নিচের দিকে দৃষ্টিপাত করে চলতেন। এদিক সেদিক দৃষ্টিপাত করতেন না। যা ছিল রাসূল সা. এর সুন্নাত এবং ‘কুল লিল মু’মিনিনা ইয়াগুজ্জু মিন আবসারিহিম’ এর বাস্তব রূপ। ছোট-বড়, পরিচিত অপরিচিত সকলকে সালাম করতেন। যা ছিল ‘আফসোস সালাম’ এর অনুসরণ। প্রয়োজনে কারো সাথে কথা বললে পূর্ণভাবে তার দিকে মুখ করে সামনা সামনি হয়ে কথা বলতেন। পেছন দিয়ে মাথা ঘুরিয়ে কথা বলতেন না। লজ্জায় কারো চোখে-চোখ রেখে কথা বলতেন না; বরং নিচের দিকে চেয়ে কথা বলতেন। চলার পথে হাতে থাকতো একটি লাঠি। যার দ্বারা রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে ফেলতেন। উল্লিখিত সবকিছুই রাসূল সা. এর সুন্নত। তিনি ছিলেন এর পূর্ণাঙ্গ অনুসারী। হযরতের তিলাওয়াতও ছিল অত্যন্ত সুন্দর ও সুমধুর। তাঁর তিলাওয়াতের মধ্যে লাহনে দাউদির প্রতিধ্বনী হচ্ছে বলে মনে হতো। তিলাওয়াত শুনার জন্যে খুব আগ্রহের সাথে লোকেরা নামাযে আসত। সকল কাজকর্মে, চলাফেরায় বিনয়ভাব পরিলক্ষিত হত। সকলের সাথে নম্র ব্যবহার করতেন। কারো সাথে কোনো কঠোরতা করেছেন বলে আমার জানা নেই। আল্লাহর এ ওলি সর্বক্ষণ আল্লাহর ধ্যান, যিকির ও ফিকিরে নিমগ্ন থাকতেন।

অসুস্থ শয্যাশায়ী অবস্থায় সিলেটের এক ক্লিনিকে আমি তাঁকে দেখেছি। তখনো অতি সংক্ষেপে দু’-চারটি কথা বলে আল্লাহ-আল্লাহ বলতে শুরু করেন। মাদরাসার শিক্ষা-দীক্ষার সব দায়-দায়িত্ব হযরত নাজিম সাহেব দা. বা. এর নিকট ন্যস্ত করে মাদরাসার আর্থিক চিন্তায় ঘুরতেন। শুক্রবার দিনে তাঁর মৃত্যুই তিনি আল্লাহর ওলি ও মাকবুল বান্দা বলে প্রমাণিত হয়। কারণ, রাসূল সা. বলেন, যার শুক্রবার দিনে মৃত্যু হবে তার কবর আযাব হবে না। মৃত্যুর অবস্থাও ছিল আশ্চর্যজনক! হযরতের সাহেবজাদা মাহমুদ হাসান বলেন, ২৫ ফেব্র“য়ারি ২০১০ ইংরেজি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আড়াইটার সময় তাঁর নিজের দুই হাত দ্বারা মুখ মুছতে লাগলেন। আমি বললাম, আব্বাজান! কী হয়েছে? আপনি কী করছেন? তিনি বলেন, শব্দ করো না।এখন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.‘র সাথে আমার সাক্ষাৎ হচ্ছে! আল্লাহর কি কুদরত! পরদিন শুক্রবার ২৬ ফেব্র“য়ারি এ নশ্বর পৃথিবী ত্যাগ করে প্রকৃত বন্ধুর (আল্লাহর) সান্নিধ্য লাভ করেন। তিনি তাঁর উস্তাদগণের প্রতি অত্যন্ত সম্মান প্রদর্শন করতেন। অতি সম্মানের সাথে উস্তাদগণের নাম উচ্চারণ করতেন। দারসের ফাকে ফাকে প্রায় বিষয়েই কেনো উস্তাদের হাওয়ালা দিতেন। বলতেন, উনি এমন বলেছেন, তিনি এমন বলেছেন। দেওবন্দের অমুক উস্তাদ এমন বলেছেন, ঢাকার অমুক উস্তাদ এমন বলেছেন, গাছবাড়ির অমুক উস্তাদ এমন বলেছেন। বিশেষ করে হযরত মাওলানা সাঈদ আলী চারাবই হুযুরের কথা প্রায়ই বলতেন এবং উস্তাদের নাম এলেই আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলতেন। উস্তদগণও হযরতকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। হযরতের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা, দুয়া, ক্রন্দন এর ফসল হল জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর। যে মাদরাসা হতে শত শত হাফিয, আলেম, মুহাদ্দিস, মুফাস্সির, ইমাম, খতিব ফারেগ হয়ে তাঁর রূহানি সন্তান হিসেবে দেশে-বিদেশে দ্বীনের খেদমত আঞ্জাম দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি ১৩৯৯ হিজরি থেকে ১৪৩১ হিজরি (মৃত্যু) পর্যন্ত এহতেমামির দায়িত্ব পালন করেন। আমি হযরতের রূহের মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ যেন হযরতকে জাযায়ে খায়ের এবং জান্নাতুল ফেরদাউস দান করেন এবং তাঁর রূহানি ফয়য ও বরকত আমাদেরকে দান করেন। আমিন।

লেখক: ফাজিলে জামিয়া

মুহাদ্দিস, শ্রী রামপুর মাদরাসা