শায়খ আবদুশ শহীদ: শৈশবকাল থেকে হযরত শায়খ আবদুল হাই রা.’র সাথে আমার ও আমার পরিবারের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর ও নিবিড়। হযরতের কাছে আমি শুধু লেখাপড়াই করিনি; বরং আমার ছাত্রজীবনে তাঁর অনেক খেদমতও করেছি। হাটহাজারিতে লেখাপড়াকালীন  এবং মেওয়া মাদরাসায় শিক্ষকতার জীবনে যদিও আমি তাঁর কাছ থেকে দূরে সরে পড়েছিলাম। কিন্তু উক্ত দূরত্ব তাঁর সান্নিধ্য গ্রহণে আমার বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। বাড়িতে এলেই তাঁর হুজরায় যেতাম। কখনও তাঁর সাথে গ্রামের কোথাও মাদরাসা-মসজিদ ইত্যাদির কাজে যেতাম। অনেক সময় তাঁর খেদমতে রাত ১২টা ১টাও হয়ে যেত। গভীর রাতে বাড়ি ফিরতাম। আমি তাঁকে কাছ থেকে দেখেছি। তাঁর আমল-আখলাক প্রত্যক্ষ করেছি। তাঁর সাথে আমার সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতার আলোকে বলতে পারি, তিনি আল্লাহর খাটি একজন ওলি ছিলেন-এতে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

১১ ও ১২ ফেব্র“য়ারি ২০১১ সালে আমার মাদরে ইলমি জামিয়া মাদানিয়া আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর অর্ধশত বছর পূর্তি ও দস্তারবন্দী উপলক্ষে জামিয়া কর্তৃপক্ষ হযরতের জীবনী নিয়ে একটি স্মারক বের করছে জেনে আমি অত্যন্ত খুশি হয়েছি। ইচ্ছা ছিল তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখব। কিন্তু লেখালেখির ব্যাপারে অভ্যস্ত নই বলে কলম হাতে নিতে সাহস পাইনি। এদিকে তাঁর জীবনের সব দিকের খুঁটিনাটি বিষয় নিয়েও অনেকে প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখছেন বলে জানতে পারলাম। তাই লেখনির ক্ষেত্রে দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও হযরতের জীবনী লেখার বরকতপূর্ণ কাজে শরিক হতে মনস্থ করলাম। এদিকে ১১ জিলহজ ১৪৩১ হিজরিতে আমার øেহাস্পদ মাওলানা মনযুর আহমদ সালিমের সাথে মেওয়া মাদরাসায় হযরতের জীবনের আংশিক দিক নিয়ে আলোচনা করি। আলোচনার ভিতর আমার জানা হযরতের কিছু কারামতের কথাও আসে। তখন মাওলানা আমাকে উক্ত ঘটনাগুলো লিখে স্মারক কমিটির কাছে পাঠানোর কথা  বললেন। তার উৎসাহ ও সহযোগিতায় আমি নিজেকে প্রস্তুত করে নিলাম এবং আমার স্মৃতির দর্পনে ভেসে ওঠা তাঁর সেসব ঘটনা লিপিবদ্ধ করে আত্মতৃপ্তি লাভ করলাম।

কারামত-১. অনুমানিক নয় দশ বছর আগের ঘটনা, ঘটনাটি আমার নিজের সাথে সংশ্লিষ্ট। হযরতের সাথে প্রায়ই ওঠা-বসার কারণে হযরত আমাকে অত্যন্ত আদর করতেন। আমার ব্যাপারে হযরতের নেক ধারণা ছিল। তাই কোনো কোনো সময় হযরত আমাকে শুক্রবার আঙ্গুরা মুহাম্মদপুর জামে মসজিদে জুমার পূর্বে ওয়াজ করার জন্য বলতেন। হযরতের নির্দেশ পালনার্থে আমি ওয়াজ করতাম। হযরতও বসে শুনতেন। একবার জুমার দিন প্রথম আযান হয়েছে। কোনো বিশেষ কারণে হযরত মিম্বরে আসতে দেরি হচ্ছে। আমি মসজিদে হযরতের আগেই প্রবেশ করলাম। তখন আমার গ্রামের কিছু মুরব্বি হযরতের স্নেহভাজন হিসেবে আমাকে ওয়াজ করতে বললেন। হযরত কিন্তু আমাকে এ সময় ওয়াজ করার জন্য নির্দেশ দেননি। মনে হচ্ছিল যেন হযরত কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যেকে সামনে রেখে নিজেই ওয়াজ করবেন। কিন্তু কই? তিনি তো আসছেন না। আমরা অপেক্ষার প্রহর গুনতে শুরু করলাম। এদিকে মুরব্বিরা আমাকে ওয়াজ করতে পীড়াপীড়ি আরম্ভ করলেন। অবশেষে বাধ্য হয়ে ওয়াজ শুরু করলাম। কিন্তু আমার বাকশক্তি রুদ্ধ হওয়ার উপক্রম হল। আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না কী ওয়াজ করব। দু’চার মিনিটের ভিতর হযরত যখন মিম্বরের সামনে এসে বসে পড়লেন। তখন আমার বাকশক্তি একেবারে রুদ্ধ হয়ে পড়ল।

এ রুদ্ধ হয়ে যাওয়া তার ভয়ে নয়। এটা তাঁর কারামতের বহিঃপ্রকাশ। যেহেতু আমি হযরতের সামনে ওয়াজ করে অভ্যস্ত। সেহেতু ভীত না হওয়ারই কথা; কিন্তু কি যেন অজানা কারণে ওয়াজ করতে আমি একেবারে অপারগ হয়ে গেলাম। তা বুঝে উঠতে পারছিলাম না। শেষ পর্যন্ত চার পাঁচ মিনিটের ভেতরে বাধ্য হয়ে মিম্বর থেকে নেমে পড়ি। এরপর হযরত সামনে বাড়েন এবং তাঁর মধুর কণ্ঠে এখলাসপূর্ণ ভঙ্গিতে ওয়াজ শুরু করেন এবং ওয়াজের ভিতর তার মনের আবেদনও লোকজনের নিকট ব্যক্ত  করেন। আমার বিশ্বাস যে, সেদিন হযরতের বিনা অনুমতিতে ওয়াজ করার কারণে এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

কারামত- ২. অনুমানিক ২০ বছর আগের ঘটনা, আমার চাচাত বড় ভাই সাদ উদ্দিন সৌদি আরবে ছিলেন। সেখানে হঠাৎ করে তার কোমরে ব্যাথা আরম্ভ হয়। সৌদিতে অনেক উন্নত চিকিৎসা করার পরও সুস্থ হচ্ছিলেন না। এ ব্যথার কারণে কাজ-কর্ম করতে পারছিলেন না। অন্যদিকে রুজি-রুজগারের প্রয়োজন। পরিশেষে অপারগ হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও সৌদি থেকে একামা কেটে ভগ্ন হৃদয়ে দেশে ফিরলেন। দেশে আসার পর অনেক ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। ডাক্তার রোগ ধরতে পারেনি। ঔষধ দিলে তা দ্বারা রোগ সারেনি। একদিন হযরত রাহ. মাদরাসার জন্য চাঁদার উদ্দেশ্যে জনাব সাদ উদ্দিনের বাড়ি যান। এ সুযোগে জনাব সাদ উদ্দিনের পিতা জনাব মুহিবুর রহমান হযরতকে তার ছেলের রোগের ব্যাপারে তার নৈরাশ্য ও পেরেশানির কথা জানালেন এবং হযরতের কাছে দুয়া চাইলেন। তখন সাথে সাথে হযরত হাত দু’খানা উঠিয়ে মহান রাব্বুল আলামিনের কাছে দুয়া করলেন। দুয়ার পর থেকে জনাব সাদ উদ্দিন সুস্থ হতে আরম্ভ করলেন এবং এখনো তিনি সুস্থাবস্থায় কানাডায় চাকরি করছেন। অদ্যাবদি তাঁর সে রোগ দেখা দেয়নি। নিশ্চয়ই হযরত রাহ. আল্লাহর কাছে মকবুল ও মুস্তাজাবুদদাওয়াত ছিলেন। সাদ উদ্দিন সাহেবের সুস্থতা হযরতের কারামত বৈ কিছু নয়। জনাব সাদ উদ্দিন এখনো বার বার হযরতের সে মকবুল দুয়ার কথা স্মরণ করেন।

কারামত-৩. অনুমানিক প্রায় পয়ত্রিশ বৎসর আগের ঘটনা, বিশ্বনাথের  একজন ছাত্র ছিল যাকে বিশেষ কারণবশত হযরত রাহ. মাদরাসা থেকে বহিষ্কার করেছিলেন। পরে কোনো কারণে উক্ত ছাত্রের পক্ষে গোবিন্দশ্রী গ্রামের মনই মিয়া চেয়ারম্যান সাহেবসহ গণ্যমান্য মুরব্বিরা তাকে মাদরাসায় রাখার জন্য সুপারিশ করেন। তার পিতাও মাদরাসায় এসে তার ভর্তি বাতিল না করার জন্য অনুরোধ করেন। মুরব্বিদের অনুরোধে ও তার পিতার পীড়াপীড়িতে হযরত রাহ. তার ভর্তি বহাল রাখেন। কিন্তু হযরতের সেই এহসানের কথা তার স্মরণ থাকেনি। তাই সে অন্যের প্ররোচনার শিকার হয়ে মাদরাসার প্যাড চুরি করে পুনরায় তার বাড়িতে হযরতের নামে বহিষ্কারাদেশ পাঠায়। ফলে গোবিন্দশ্রীবাসীর মাদরাসার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন  করার উপক্রম হয়। এ জালিয়াতির মাধ্যমে হযরতকে সমাজে কলঙ্কিত করার চক্রান্ত করা হয়। অবশেষে সে ছাত্রটি মাদরাসা থেকে চলে যায়। এখান থেকে চলে যাওয়ার পর তার এমন মারাত্মক চর্মরোগ দেখা দেয় যে, কোনো চিকিৎসা তাতে কাজে আসেনি। রোগ এমন পর্যায়ে পৌঁছে যে, কোন লোক তার কাছে আসে না, বসেও না। সে সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার উপক্রম হয়। অবশেষে সে ছাত্রটি অনুধাবন করতে পারে যে, হযরতের সাথে তার বেআদবির কারণেই তার এ অবস্থা হয়েছে। তাই বহুদিন পর সে হযরতের কাছে এসে ক্ষমা চেয়ে নেয়। এরপর থেকেই সে সুস্থ হয়ে যায়। নিশ্চই আল্লাহর ওলিদের সাথে বেআদবির এমন পরিণতিই হয়ে থাকে। তার এ পরিণতি হযরতের কারামত ছাড়া আর কিছুই নয়।

লেখক: সাবেক শিক্ষার্থী, জামেয়া আঙ্গুরা

শিক্ষক, মেওয়া মাদরাসা, বিয়ানীবাজার, সিলেট।