আল্লামা নূর হোছাইন কাসিমি

ইলমে দ্বীন হলো শাহি ইলম। যারা ইলমে দ্বীন অর্জন করবে তারা শাহি চিন্তার অধিকারী হবে। পুরো জাতিকে নিয়ে চিন্তা ভাবনা করবে। একজন মুচি জুতা সেলাই করে। সে সর্বদা জুতার চিন্তায় ব্যস্ত থাকে। সে সব সময় মানুষের পায়ের দিকে তাকিয়ে থাকে। তার চিন্তা এ পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। আর কুরআন পুরো জাতির জন্য নাযিল হয়েছে। সুতরাং যারা কুরআনের ধারক-বাহক হবে, তারা পুরো জাতিকে নিয়ে চিন্তা করবে। কুরআনের শিক্ষা জাতীয় শিক্ষা। আবার কুরআন আল্লাহর পক্ষ হতে নাযিলকৃত ওহি। কুরআন-হাদিসের জ্ঞান যেমন ওহি, তেমনি হাদিসের শিক্ষাও ওহি। তাই ইমাম বুখারি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তার কিতাব কিতাবুল ওহি দ্বারা শুরু করেছেন।
এই ইলমে দ্বীন ও ইলমে ওহি সবাই অর্জন করতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা কুরআনে কারীমে ইরশাদ করেন, “তিনি যাকে চান তাকে দীনের জ্ঞান দান করেন।” অতএব তোমরা যারা ইলমে দ্বীন অর্জন করার জন্য এসেছো, নিঃসন্দেহে বলা যায় আল্লাহ তোমাদেরকে পছন্দ করেছেন। নির্বাচিত করেছেন। ভালবেসেছেন। এজন্যই তোমাদেরকে মাদরাসায় নিয়ে এসেছেন। দীনের জ্ঞান শিক্ষা করার সুযোগ দিচ্ছেন।
ছাত্রদের দায়িত্ব কী? ছাত্রদের কাজ হচ্ছে, তোমরা উস্তাযদের আদব, ইহতেরাম রক্ষা করে চলবে। উস্তাদের সম্মানের দিকে লক্ষ রাখবে। উস্তাদের প্রয়োজন পূরণে সচেষ্ট থাকবে। ত্যাগ ও কুরবানির মেজাজ থাকতে হবে। যে ত্যাগ ও কুরবানি করবে, কষ্ট স্বীকার করবে, নিঃসন্দেহে আল্লাহপাক তার জন্য রহমতের দরজা খুলে দিবেন। আল্লাহপাক বলেন, ‘যে চেষ্টা করে আমি তার জন্য অনেক দরজা খুলে দেই।’
যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে টিকিয়ে রাখা ও সুন্দরভাবে পরিচালনা করার জন্য প্রয়োজন প্রতিষ্ঠানের নিয়ম-নীতি মেনে চলা। প্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা রক্ষা করা। যখন উস্তায-ছাত্রের মাঝে এ কাজগুলো পাওয়া যাবে তখন পড়াশোনায় উন্নতি হবে। ইলমে বরকত হবে।
ছাত্রদের চারটি বিশেষ কাজ করার জন্য ইমাম বুখারি তার রুবায়িয়্যাতে উল্লে¬খ করেছেন। আওজাযুল মাসালিকে শায়খুল হাদিস জাকারিয়া রহ.ও বুখারির প্রথম হাদিসে একই কথা উদ্দেশ্য নিয়েছেন। বিষয় চারটি হলো:
১.রেজায়ে মাওলা।
২.ইলম অনুযায়ী আমল।
৩.বক্তৃতার মাধ্যমে সারাবিশ্বে ইলম ছড়িয়ে দেয়া।
৪.লেখনির মাধ্যমে সারাবিশ্বে ইসলাম প্রচার করা।
ইলম অর্জনের জন্য একাগ্রতা প্রয়োজন। একাগ্রতার সাথে যদি ইলম অর্জন করি তা হলে ইলমে বরকত হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জাবালে হেরায় অবস্থান করেছেন। একাগ্রতার সাথে তিনি আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। জাবালে হেরা মক্কা থেকে তিন কিলোমিটার দূরে। সেখান থেকে বায়তুল্লাহ দেখা যায়। ইরশাদুল মুলুক গ্রন্থে রয়েছে, নবি করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সেখানে ১৫বছর অবস্থান করেছেন। অনেকে আরো কমবেশিও উল্লে¬খ করেছেন। তবে যাই হোক, মূল কথা হলো- ইলম অর্জনের জন্য ইনহিমাক বা একাগ্রতা নেহায়েত জরুরি।
বর্তমানে ছাত্রদের জন্য একটি বড় ফেতনা হলো, মোবাইল ফোন। এই মোবাইল ফোন ছাত্রদের জীবনকে নষ্ট করে দিচ্ছে। সুতরাং প্রতিটি তালিবুল ইলমকে নিজে থেকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, যতদিন পর্যন্ত রুসমী তালিবুল ইলম থাকবো, ততদিন পর্যন্ত মোবাইল-ফোন ব্যবহার করবো না। ফারাগাতের আগ পর্যন্ত মোবাইল হাতে না নেয়ার সংকল্প করতে হবে। তাহলেই সফলতা ছাত্রদের পদচুম্বন করবে।
দুনিয়াতে সম্মান পেতে চাইলে মা বাবার খেদমত করা। আর ইলম থেকে উপকৃত হতে চাইলে উস্তাদের আদব ইহতেরাম করা। সুতরাং উস্তাদের ইহতেরাম করতে হবে। তা হলে ইলম থেকে উপকৃত হওয়া যাবে।
উস্তাদের পাশাপাশি কিতাবের ইহতেরাম করতে হবে। আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. কিতাবের এতো ইহতেরাম করতেন যে, তিনি নিজে ঘুরে ঘুরে হাশিয়া মুতালাআ করতেন।
ইলম আসবে তাকওয়া দ্বারা। কারণ ইলম হলো নূর। এই নুর পবিত্র পাত্রে রাখতে হবে। অপবিত্র পাত্রে এই ইলমের কোনো স্থান নেই। সুতরাং গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে। গুনাহের কাজ সম্পৃক্ত হলে সঠিক ইলম অর্জন করা সম্ভব হবে না।
আশরাফ আলী থানবি রহ. বলেন, ছাত্রের তিন কাজ। ছাত্রের কাজ হলো-
১. সহিহ ইবারাত পড়া।
২. সহিহ তরজমা করা।
৩. সহিহ মতলব বুঝা।
এজন্য ছাত্রদের বেশি বেশি মেহনত করতে হবে। কিতাবের প্রতি অধিক মনোযোগী হতে হবে। অনেকে প্রশ্ন করে, ইবারাত সহিহ কীভাবে করবো? এর উত্তর হলো- নাহবেমীর কিতাবে একটি ইবারাত আছে। যাতে চারটি বিষয় রয়েছে। কেউ যদি এই ইবারাতের প্রতি লক্ষ্য রাখে, তা হলে সে ইবারাত হল করতে পারবে। কাজ চারটি হলো–
১. ইবারাতে দেখতে হবে- কোনটা ইসম, কোনটা ফে’ল ও কোনটা হরফ।
২. মুরাব না মাবনী তা লক্ষ্য করতে হবে।
৩. আমেল না মামুল, তা নির্ণয় করতে হবে । আমেল ১০০ টি। মামুল ২৭ প্রকার। এগুলো ভালো করে বুঝে নিতে হবে।
৪. মুসনাদ ও মুসনাদ ইলাইহি ঠিক করা।
এই চারটি বিষয় ঠিক হয়ে গেলে ইবারাত সহিহ হয়ে যাবে।
আমরা এখানে বনার (গঠন হওয়ার) জন্য এসেছি। বনতে হলে আসাতিযায়ে কেরামের দিকনির্দেশনা অনুযায়ী চলতে হবে। এখানে একদল আছেন গড়ার জন্য, তারা হলেন উস্তায। আরেকদল আছেন বনার জন্য, তারা হলেন তালিবুল ইলম। আমাদেরকে আসাতিয়ায়ে কেরাম ইলমিভাবেও গড়বেন, আমলিভাবেও গড়বেন। আমাদের উচিৎ আসাতিযায়ে কেরামের কদর করা। তাদের যথাযথ সম্মান করা।

লেখকপরিচিতি
মুহতামিম ও শায়খুল হাদিস
জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা, গুলশান, ঢাকা

Leave a Reply

Your email address will not be published.